
আবদুল আজিজ
পরিকল্পনা ও প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালের মার্চে বাঙালির অসহযোগ আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মুখে পাকিস্তান সামরিক জান্তা বেসামরিক জনগণের ওপর সামরিক দমন-অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
২৫ মার্চ রাতে এই অভিযান শুরু হওয়ার আগে থেকেই এর নামকরণ করা হয় “অপারেশন সার্চলাইট” (Operation Searchlight)। পরিকল্পনাটির মূল স্থপতি ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী।
পরিকল্পনা প্রণয়নে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মেজর জেনারেল রাও ফারমান আলী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অন্যদিকে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল টিক্কা খান এই পরিকল্পনার সামরিক বাস্তবায়নের সময় রাজনৈতিক প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা (তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধান সেনাপ্রধান) চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।
কৌশলগত প্রভাবের প্রশ্ন:
গবেষকদের মতে, এই অভিযানের কৌশলগত দিক—বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী নিধন, সম্ভাব্য প্রতিরোধকেন্দ্রগুলোকে প্রথম ঘায়েল করা এবং পোড়ামাটির নীতি—আংশিকভাবে মার্কিন সেনাবাহিনীর ভিয়েতনাম যুদ্ধকালীন কিছু দমনমূলক অভিযানের (যেমন, ‘ফিনিক্স প্রোগ্রাম’) প্রভাবে তৈরি হয়েছিল। তবে “অপারেশন মেলাম” নামে একটি নির্দিষ্ট বৈদেশিক অভিযানের প্রতিলিপি হিসেবে এটি তৈরি হয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। এটি ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিজস্ব নকশায় প্রণীত একটি সামরিক দমন-অভিযান, যাতে পোড়ামাটির নীতি (scorched earth policy) ও পরিস্কার অভিযান (cleansing operation) -এর মতো ধারণা সুস্পষ্ট ছিল।
অভিযান শুরু ও মূল লক্ষ্যস্থল
২৫ মার্চ মধ্যরাতে (২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে) ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে একযোগে এই অভিযান শুরু হয়। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক, সামরিক ও বুদ্ধিজীবী শক্তিকে নির্মূল করা। প্রথম রাতে বিশেষভাবে তিনটি স্থানে সমন্বিত আক্রমণ চালানো হয়:
রাজারবাগ পুলিশ লাইনস: এখানে বাঙালি পুলিশ সদস্যদের উপর ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রের আক্রমণ চালানো হয়। এই আক্রমণের নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা (পরবর্তীতে পাকিস্তানের সামরিক শাসক) এবং মেজর জেনারেল রাও ফারমান আলী পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
পিলখানা (ইপিআর সদর দপ্তর): তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) সদর দপ্তরে অবস্থানরত বাঙালি সদস্যদের নিরস্ত্র ও হত্যার জন্য সেনাবাহিনী আক্রমণ চালায়। এই স্থানটি ছিল অভিযানের অন্যতম প্রধান টার্গেট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা: ছাত্র, শিক্ষক ও সম্ভাব্য বুদ্ধিজীবীদের লক্ষ্য করে ইগল স্কোয়াড ও সেনাবাহিনীর বিশেষ ইউনিট নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। ইগল স্কোয়াডের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফারমান আলী। জগন্নাথ হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, শিক্ষক-ছাত্র কেন্দ্রসহ বিভিন্ন আবাসিক হলে ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
এই তিনটি স্থানসহ ঢাকার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অভিযান ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত, যার উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য প্রতিরোধের মূল অংশকে প্রথম রাতেই ধ্বংস করে দেওয়া।
গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সংবাদ প্রকাশ:
এই গণহত্যার খবর প্রথম দিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ পেতে শুরু করে। ৩০ মার্চ, ১৯৭১-এ ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং (Simon Dring) দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন। এছাড়া অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, সিডনি শ্যানবার্গ প্রমুখ সাংবাদিকও সে সময় প্রত্যক্ষদর্শীর ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে বাংলাদেশের গণহত্যার তথ্য উপস্থাপিত হয়।
প্রতি বছর ২৫ মার্চ রাত ১০টা ৩০ মিনিটে বাংলাদেশ এক মিনিটের জন্য আলো নিভিয়ে দেয়। এটি কোনো সাধারণ অন্ধকার নয়; এটি ১৯৭১ সালের সেই রাতের প্রতিধ্বনি, যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নেমে এসেছিল সুপরিকল্পিত গণহত্যার ভয়াবহ রূপ নিয়ে।