
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
তারিখ: ৩১ মার্চ ২০২৬
রাজধানীর উত্তরা এলাকায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলা, অতিরিক্ত বিল আদায়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রশাসনিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একাধিক ভুক্তভোগী পরিবার দাবি করেছে, এসব অনিয়মের কারণে রোগীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।
সম্প্রতি উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার কারণে এক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের অভিযোগ, উত্তরার আরও কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালেও নিয়মিতভাবে ভুল চিকিৎসা ও অব্যবস্থাপনার ঘটনা ঘটছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ
জানা যায়, দক্ষিণখান এলাকার বাসিন্দা জাহানারা বেগম (৫৮) গত ২২ এপ্রিল হালকা স্ট্রোক নিয়ে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। পরিবারের অভিযোগ, ভর্তির পরপরই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অর্থ আদায়ে মনোযোগী হয়ে ওঠে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
মৃতের ছেলে অপু অভিযোগ করেন,
“দুই দিন ধরে একের পর এক টেস্ট করানো হয়, কিন্তু রোগীর অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে বড় অপারেশনের কথা বলে অন্য হাসপাতালে নিতে বলা হয়।”
পরবর্তীতে রোগীকে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ ভর্তি করা হলেও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় বলে দাবি পরিবারের। রোগীর মেয়ের ভাষ্য,
“সকাল-বিকাল শুধু টেস্ট আর ওষুধ—কিন্তু চিকিৎসার উন্নতি ছিল না। প্রশ্ন করলে উল্টো ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।”
হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ
অনিয়মের ধরন: যা উঠে এসেছে অনুসন্ধানে
অনুসন্ধানে বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে—
১. অতিরিক্ত বিল ও অর্থ আদায়
রোগীদের অভিযোগ, সাধারণ পরীক্ষাকেও জরুরি দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়। ICU/CCU চার্জ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো এবং ছাড়পত্রের সময় গোপন বিল যুক্ত করার ঘটনাও রয়েছে।
২. অপ্রয়োজনীয় টেস্ট ও কমিশন বাণিজ্য
রোগীর প্রয়োজন না থাকলেও একাধিক পরীক্ষা করানো এবং নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
৩. অদক্ষ চিকিৎসক দিয়ে সেবা প্রদান
জুনিয়র চিকিৎসকদের দিয়ে সিনিয়র চিকিৎসকের নামে প্রেসক্রিপশন দেওয়া এবং ভুল চিকিৎসার কারণে রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটার অভিযোগ উঠেছে।
৪. লাইসেন্স ও নীতিমালা লঙ্ঘন
অনেক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন নেই, প্রয়োজনীয় ICU সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও ICU নামে রোগী ভর্তি করা হচ্ছে—যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনার পরিপন্থী।
৫. রোগীদের সঙ্গে অসদাচরণ
জরুরি রোগী ভর্তি নিতে গড়িমসি, অর্থ ছাড়া চিকিৎসা শুরু না করা এবং মৃত রোগীর ক্ষেত্রেও বিল আদায়ে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রশাসনিক তদারকির অভাব
স্বাস্থ্যখাতে সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ তদারকি ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাবে এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলমান রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
প্রয়োজন দ্রুত ব্যবস্থা
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি, নিয়মিত অডিট এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।