
ঢাকা, উত্তরা প্রতিনিধি:
রাজধানীর উত্তরা তুরাগ এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো–৩ সার্কেল কার্যালয়ে দালালদের দৌরাত্ম্য চরম আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দিয়াবাড়ি বিআরটিএ কার্যালয় চত্বর থেকে শুরু করে আশপাশের দোকানপাট, অলিগলি এমনকি অফিসের ভেতরেও দালালদের প্রকাশ্য তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।
সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগীরা জানান, ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ি নিবন্ধন, যানবাহনের ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেন ও রুট পারমিটসহ প্রায় সব ধরনের সেবা পেতে দালালদের দ্বারস্থ না হলে নানা অজুহাতে কাজ বিলম্বিত করা হয়। অথচ দালালের মাধ্যমে জমা দিলে একই কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়ে যায়।
এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬) দুপুর আড়াইটার দিকে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহে যান দৈনিক জনতা’র উত্তরা প্রতিনিধি কামরুজ্জামান এবং দৈনিক নবচেতনার স্টাফ রিপোর্টার মাসুদ রানা। এ সময় বিআরটিএ চত্বরে দালালদের প্রকাশ্য তৎপরতা তাদের নজরে আসে।
সাংবাদিকরা দেখতে পান, দালালরা সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কাগজপত্র সংগ্রহ করে টাকা আদায়ে ব্যস্ত। এক পর্যায়ে এক সেবা গ্রহীতার কাছ থেকে ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগে শাহীন নামের এক ব্যক্তিকে অনুসরণ করেন তারা। পরে বিআরটিএ’র ২ নম্বর ভবনের পঞ্চম তলায় পরিদর্শকদের কক্ষে তাকে হাতেনাতে ধরা হলে উপস্থিত কয়েকজন স্টাফ সাংবাদিকদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
এ সময় শাহীন নিজেকে বিআরটিএ’র স্টাফ দাবি করলেও কোনো পরিচয়পত্র দেখাতে পারেননি। পরে মোটরযান পরিদর্শক মিলন সাংবাদিকদের বিষয়টি নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি না করতে বলেন এবং সহকারী পরিচালক বশির উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলতে পরামর্শ দেন।
পরবর্তীতে সহকারী পরিচালক বশির উদ্দিনের কক্ষে গিয়ে শাহীনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে তাকে চেনেন না বলে দাবি করেন। একই সময় তার কক্ষে থাকা শুভ নামের এক বহিরাগত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, শাহীন ও শুভরা অফিসে পিয়নের কাজ করে এবং কর্মচারীদের পানি ও খাবার পরিবেশন করে থাকে।
সাংবাদিকরা প্রশ্ন তোলেন, সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এত বহিরাগত ব্যক্তি কীভাবে পিয়নের কাজ করেন। এ প্রশ্নে সহকারী পরিচালক বশির উদ্দিন ক্ষিপ্ত হয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “যা করতে পারেন, করেন গে।”
এরপর শাহীনকে নিয়ে নিচে নামলে দালাল টিটু, মিজান ও সুমনের নেতৃত্বে প্রায় ১৫–২০ জনের একটি দল সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। হামলায় সাংবাদিক মাসুদ রানার অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়, যাতে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ ছিল। পাশাপাশি সাংবাদিক কামরুজ্জামানের পকেটে থাকা প্রায় ১৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ সময় হামলাকারীরা সাংবাদিকদের মারধর ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের পাশাপাশি প্রাণনাশের হুমকিও দেয়।
পরে ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশে খবর দেওয়া হলে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার বিকেলে তুরাগ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বিআরটিএ ভবনের পাশের একটি কম্পিউটার দোকান পরিচালনাকারী মিজান এই দালাল চক্রের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী। অভিযোগ রয়েছে, তার নেতৃত্বে কয়েকজন স্টাফের সহযোগিতায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ চক্রের সক্রিয় সদস্যদের মধ্যে টিটু, সুমন, সুজন, আবু বকর ও ফরিদসহ প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি জড়িত বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, দালালির মাধ্যমে আদায়কৃত টাকার একটি অংশ সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যেও ভাগাভাগি হয়।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি, বিআরটিএ কার্যালয়ে দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে সেবাগ্রহীতাদের স্বাভাবিক সেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।