
শিল্পনগরী গাজীপুর-এ প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে রাতের আঁধারে চলছে ভেকু দিয়ে অবৈধ মাটি কাটার মহোৎসব। রাত যত গভীর হয়, ততই বাড়ে ‘মাটিখেকো’ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। সরেজমিনে গাজীপুর মহানগরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ড, বাসন থানাধীন ইসলামপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়—তিনটি ড্রাম ট্রাকে করে বিরতিহীনভাবে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ট্রাকচালকের কাছে মাটির উৎস জানতে চাইলে তিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থেকে জানান, সরকারি জমি থেকে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে ড্রাম ট্রাকের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। এই সিন্ডিকেটে কারা জড়িত—এমন প্রশ্নে তিনি দম্ভভরে বলেন, “এলাকার বড় বড় নেতা-কর্মীরা এর সঙ্গে যুক্ত। অনেক সাংবাদিকও এসে খরচ নিয়ে চলে যায়। আমরা প্রশাসন ম্যানেজ করেই ব্যবসা করি।”
পরবর্তীতে লিটন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্য দেওয়ার পরিবর্তে টাকার বিনিময়ে ‘মুখ বন্ধ’ রাখার প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একই চিত্র দেখা গেছে সদর থানাধীন কারখানা বাজার এলাকায়। সেখানে তিনটি ভেকু মেশিন ও অন্তত ১০টি ড্রাম ট্রাক দিয়ে চলছে মাটি কাটার কার্যক্রম। শতাধিক ব্যক্তি পাহারা দিচ্ছে, যাতে কেউ ছবি বা ভিডিও ধারণ করতে না পারে। উপস্থিতি টের পেয়ে তারা বাধা প্রদান করে এবং বিল্লাল নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে বলে। তবে ঘটনাস্থলে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এক পর্যায়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা হলে ৩৩৩ নম্বরে কল করতে বলা হয়। কিন্তু রাতের বেলায় ওই নম্বরে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সুযোগে প্রভাবশালী চক্রটি কৃষিজমি খুঁড়ে গভীর গর্ত তৈরি করে মাটি লুটপাট করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারি না। বাধা দিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। আমাদের আবাদি জমি ডোবায় পরিণত হচ্ছে, অথচ প্রশাসন সব জেনেও নীরব।”
আইন অনুযায়ী, বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ মোতাবেক কৃষিজমি থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া কোনো আবাদি জমি বা সরকারি জমি থেকে মাটি কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। এতে জমির উপরিভাগের উর্বর অংশ (টপ সয়েল) নষ্ট হয়ে যায়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উপরিভাগের মাটি কেটে নিলে ওই জমিতে আগামী ১০-১৫ বছরেও আশানুরূপ ফলন পাওয়া কঠিন। পাশাপাশি গভীর গর্তের কারণে পার্শ্ববর্তী জমি ধসে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়।
এছাড়া ভারী ড্রাম ট্রাক চলাচলের কারণে গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করছে।
গাজীপুরবাসীর জোর দাবি, অবিলম্বে এই ‘মাটিখেকো’ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কৃষিজমি ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা। প্রশাসনের নীরবতা ভাঙবে এবং দোষীরা আইনের আওতায় আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী জনগণের।
অন্যথায়, শিল্পনগরী গাজীপুর তার উর্বর কৃষিজমি হারিয়ে পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল। এখন সময় আইনের যথাযথ প্রয়োগের—না হলে এই অবৈধ মাটি কাটার হিড়িক থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।