
কাজি আরিফ হাসান
একটি গুলির শব্দ থামিয়ে দিতে পারেনি একটি কণ্ঠস্বরকে—বরং সেই কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে পড়েছে লাখো মানুষের হৃদয়ে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি আর নেই, কিন্তু তার আদর্শ, তার শ্লোগান, তার আপোষহীন প্রতিবাদ আজ পুরো জাতির কণ্ঠস্বর।
গত ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার রাজধানীতে সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত হামলায় মাথার নিচ বরাবর গুলিবিদ্ধ হন শরীফ ওসমান হাদি। মুহূর্তেই তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় সড়কে লুটিয়ে পড়েন। আহত অবস্থায় প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে।
অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়।
দীর্ঘ চিকিৎসা ও জাতির প্রার্থনার পরও জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে পারেননি এই বিপ্লবী নেতা। গত বুধবার সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সেই খবর পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই শোকের ছায়া নেমে আসে সারাদেশে।
লাল-সবুজে মোড়ানো কফিন, অশ্রুসিক্ত বিদায়
গত ১৯ ডিসেম্বর শুক্রবার রাতে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনে করে হাদির মরদেহ ঢাকায় পৌঁছায়। প্রথমে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হিমাগারে এবং পরে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ নেওয়া হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। জানাজার আগেই সেখানে লাখো মানুষ জমায়েত হয়। কানায় কানায় ভরে ওঠে সংসদ ভবন এলাকা—একটি কফিনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা মানুষের ঢল।
বেলা ২টায় অনুষ্ঠিত জানাজায় ইমামতি করেন হাদির বড় ভাই আবু বকর। জানাজায় অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা, সেনাবাহিনীর প্রধান, বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি সাদেক কায়েম, হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
“তুমি কে, আমি কে—হাদি, হাদি”
জানাজার মাঠজুড়ে বারবার ধ্বনিত হয়েছে একটি শ্লোগান—
“তুমি কে, আমি কে—হাদি, হাদি”
এই শ্লোগান শুধু শব্দ ছিল না; এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক ঘোষণা। শরীফ ওসমান হাদি শিখিয়ে দিয়ে গেছেন—ভয় নয়, আপোষ নয়, প্রতিবাদই মুক্তির পথ।
নজরুলের পাশে চিরনিদ্রা
বেলা ৩টার দিকে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে তার মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। বিদ্রোহী কবির পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়া যেন তার জীবনের প্রতীকী পরিণতি—বিদ্রোহের উত্তরাধিকার হয়ে থাকা এক বিপ্লবীর শেষ ঠিকানা।
মৃত্যু থামাতে পারেনি আন্দোলন
দাফন শেষে রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে ব্লকেড কর্মসূচি পালন করেন সাধারণ মানুষ। বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। হাদির মৃত্যু একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়—এটি হয়ে উঠেছে একটি জাতীয় প্রতিবাদের আগুন।
গ্রামের বাড়ি থেকে রাষ্ট্রীয় ইতিহাস
বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার সন্তান শরীফ ওসমান হাদি অল্প বয়সেই হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের কণ্ঠস্বর। ক্ষমতার কাছে মাথা নত না করে, অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ না করে তিনি দেখিয়ে গেছেন প্রতিবাদের সাহস।
হাদি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন প্রশ্ন—
অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়াবো তো?
এই প্রশ্নই তাকে অমর করেছে।