
কাজি আরিফ হাসানঃ
গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি পর্যন্ত এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক। যাত্রী পরিবহনে সহজলভ্য হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে এ যানবাহনের চাহিদা বাড়লেও, বেপরোয়া চলাচল ও অনিয়ন্ত্রিত পরিচালনার কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা। আহত-নিহতের সংখ্যাও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
প্রায়ই দেখা যায়, অতিরিক্ত গতি কিংবা অসাবধানতার কারণে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যাচ্ছে অথবা মুখোমুখি সংঘর্ষে পড়ছে। কখনো পথচারী, কখনো মোটরসাইকেল কিংবা অন্য যানবাহনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ঘটছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এসব দৃশ্য এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর উত্তরাঞ্চলের দক্ষিণ খান, উত্তর খান, খিলক্ষেত, মিরপুর, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা। বিশেষ করে দক্ষিণ খান বাজার থেকে কসাইবাড়ি, হাজী ক্যাম্প, উত্তর খান মাজারসহ বিভিন্ন রুটে সারাদিন চলাচল করতে দেখা যায় এসব যানবাহন। অনেক স্থানে রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকায় পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে এবং বাড়ছে যানজট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ অটোরিকশার নেই কোনো বৈধ অনুমোদন বা ফিটনেস সনদ। ফলে মাঝরাস্তায় চাকা খুলে যাওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটিতে যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে থাকা এবং দুর্ঘটনার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। এছাড়া অধিকাংশ চালকের নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কিংবা বৈধ ড্রাইভিং দক্ষতা। যাত্রী ওঠা-নামার সময় হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে দেওয়ায় পেছনের যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক গ্যারেজ মালিকের অধীনে ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত অটোরিকশা রয়েছে। এসব গাড়ি চালাতে দেওয়া হয় উঠতি বয়সী কিশোর ও যুবকদের, যাদের অনেকেরই নেই কোনো পরিচয়পত্র বা প্রশিক্ষণ। ফলে বেপরোয়া চালনার কারণে প্রতিদিনই কোনো না কোনো দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমনকি অনেক চালককে মহাসড়কেও ঝুঁকিপূর্ণভাবে অটোরিকশা চালাতে দেখা যায়।
অন্যদিকে, প্রতিটি অটোরিকশায় ব্যবহৃত হয় ১২ ভোল্টের চারটি ব্যাটারি, যা গ্যারেজে চার্জ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করা হয়। বৈধ সংযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক হারে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হয় না। এতে বিদ্যুৎ বিভাগ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। শুধু দক্ষিণ খান থানাধীন এলাকাতেই শতাধিক অটোরিকশা গ্যারেজ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, অটোরিকশা ও ইজিবাইক অনেক মানুষের জীবিকার মাধ্যম। তাই হঠাৎ করে এসব যানবাহন বন্ধ করে দিলে লাখো মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। তারা মনে করেন, প্রথমে বন্ধ শিল্প-কারখানা যেমন পাট, চামড়া ও চিনিশিল্প পুনরায় চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু এবং অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
সচেতন মহল আরও বলছে, কিশোরদের দিয়ে অটোরিকশা চালানো বন্ধ করতে হবে এবং চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা বন্ধ ও ট্রাফিক আইন মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের দাবি, অটোরিকশা-ইজিবাইকের চলাচল নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন, ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় নগরজীবনে যানজট, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।