
এ কে এম আজিজুর রহমান
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বৈষম্যের এই সময়ে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যার মাধ্যমে সহায়তা সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থা সেই লক্ষ্য পূরণের একটি নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
ফ্যামিলি কার্ড মূলত পরিবারভিত্তিক একটি পরিচিতি ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি একটি নির্দিষ্ট পরিবারের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়। এই কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয়, সামাজিক অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। ফলে রাষ্ট্র সহজেই নির্ধারণ করতে পারবে কোন পরিবার কী ধরনের সহায়তার জন্য উপযুক্ত। সহজভাবে বলতে গেলে, ফ্যামিলি কার্ডের লক্ষ্য হলো সামাজিক সহায়তা কার্যক্রমকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর করা।
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাসে দেখা যায়, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় বিভিন্ন দেশে বহু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইংল্যান্ডের দরিদ্র আইন, বেভারেজ রিপোর্ট কিংবা আমেরিকার সামাজিক সংস্কার আন্দোলন—এসব উদ্যোগই দেখায় যে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি ও তথ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে এসব কর্মসূচি আরও কার্যকর ও সুসংগঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশেও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য বিতরণ—এসব উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র মানুষের সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচি বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে এসব উদ্যোগকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে নিম্নআয়ের ও হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য নাগরিককেও এতে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে আটটি বিভাগের আটটি উপজেলায় এটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটিও গঠন করা হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—পরিবারের নারী সদস্যকে এই কার্ডের প্রধান হিসেবে বিবেচনা করার পরিকল্পনা, যা নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থার অন্যতম বড় সুবিধা হলো প্রকৃত দরিদ্র পরিবারকে সহজে শনাক্ত করা। জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়সংক্রান্ত তথ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনের যাচাইয়ের মাধ্যমে একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি করা গেলে সহায়তা বণ্টনে স্বচ্ছতা বাড়বে।
এতে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব কমবে এবং একই পরিবার একাধিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
এছাড়া এই কার্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরিতে সহায়তা করবে। এই তথ্যভাণ্ডার থেকে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। ফলে নীতিনির্ধারকেরা বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে তার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। এই পরিস্থিতিতে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকিযুক্ত পণ্য ও সহায়তা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া একটি কার্যকর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে পারে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সঠিক ও হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করা একটি বড় কাজ। বিশাল জনগোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহ ও তা নিয়মিত আপডেট রাখা সহজ নয়। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব বা ভুল তথ্যের কারণে প্রকৃত দরিদ্র বাদ পড়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে। পাশাপাশি নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, ফ্যামিলি কার্ড বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ দরিদ্র মানুষের সুরক্ষা জোরদার করার পাশাপাশি একটি টেকসই ও শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
প্রাথমিকভাবে বনানী কড়াইল বস্তি, পাংশা, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, বান্দরবান লামা , খুলনার খালিশপুর ,চরফ্যাশন , ডিরাই ভৈরব ,বগুড়া , সদর লালপুর ঠাকুরগাঁও ও নবাবগঞ্জ এলাকার হতদরিদ্র পরিবারগুলো এর আওতাভুক্ত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশের সব উপজেলায় এই কার্ডের কার্যক্রম আওতায় আসবে ।