
হাকিকুল ইসলাম খোকন, নিউইয়র্ক
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে প্রার্থিতার তীব্র বিরোধিতা করেছেন বাংলাদেশি ডায়াসপোরা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্তত ৮৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। এঁদের মধ্যে একাডেমিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক,কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, গবেষক, রাজনীতিবিদ,লেখক,মানবাধিকারকর্মী,পেশাজীবী,নাগরিক সমাজের নেতা ও সম্প্রদায় প্রতিনিধির পাশাপাশি নির্বাসিত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাও রয়েছেন।খবর আইবিএননিউজ।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (বিএইচআরডব্লিউ)-এর উদ্যোগে ৮ এপ্রিল জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্থায়ী প্রতিনিধিদের কাছে একটি বিস্তারিত আবেদনপত্র জমা দেওয়া হয়। পত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের প্রার্থিতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে স্বাধীন ও কঠোর ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ (যথাযথ পর্যালোচনা) করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পত্রে উত্থাপিত প্রধান অভিযোগসমূহ:
পত্রে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র খলিলুর রহমান যে সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং যেখানে তিনি জ্যেষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতির দায়িত্ব পালন করছেন, সেই সরকারের অধীনে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত নির্যাতন চলছে। লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে রাজনৈতিক বিরোধীদের (বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী-সমর্থক), ১৯৭১-এর স্বাধীনতার উত্তরাধিকারীদের এবং হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশে চলমান বিচারবহির্ভূত আটক, গুম, হত্যা, রাজনৈতিক মামলা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা এবং স্বাধীনতার ইতিহাস-সংক্রান্ত বর্ণনা দমনের ঘটনা। আবেদনকারীরা মনে করেন, এ ধরনের সংগঠিত নিপীড়নের সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে মানবাধিকার ও সমান মর্যাদার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন না।
ব্যক্তিগত আচরণ ও সততা নিয়ে প্রশ্ন
চিঠিতে খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত জীবন ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মৃত্যু ঘটনাকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে উল্লেখ করা হয়। আবেদনকারীরা বলেছেন, এসব অমীমাংসিত অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিষয় নয়, বরং জাতিসংঘের উচ্চপদের জন্য প্রয়োজনীয় জবাবদিহিতা, মর্যাদা ও নৈতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নেতৃত্বের ধরন ও সততার প্রশ্ন
পত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে, তিনি পরামর্শ ও ঐকমত্যের পরিবর্তে একতরফা সিদ্ধান্ত নেন—যা জাতিসংঘের বহুপাক্ষিক কূটনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণা, কারসাজি, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
আবেদনকারীরা মনে করেন, এসব অভিযোগ তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নেতৃত্বের জন্য তাঁকে অনুপযুক্ত করে তোলে। চিঠিতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বহুত্ববাদের সীমাবদ্ধতা, নাগরিক সমাজের দমন ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে।
খলিলুর রহমান একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদ। তিনি ড.মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে জাতিসংঘের ইউএনসিটিএডি-তে ২৫ বছর গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে তাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়, যা অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল।
ব্রাজিল তাঁর প্রার্থিতাকে সমর্থন জানিয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ফিলিস্তিন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় তিনি এখন সাইপ্রাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে জুন ২০২৬ সালে নিউইয়র্কে।
ভারত সরকার এখনও আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি, তবে বাংলাদেশি গণমাধ্যমে বলা হয়েছে যে, সদ্য প্রত্যাহার করে নেয়া ভারতীয় হাইকমিশনারকে বাংলাদেশ সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
আবেদনকারীদের আহ্বান
৮৬ জন স্বাক্ষরকারী জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন— অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যথাযথ পর্যালোচনা করা হোক, বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে স্বচ্ছতা দাবি করা হোক এবং মানবাধিকার সংস্থা ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে পরামর্শ করা হোক।
তাঁরা বলেছেন, প্রার্থীর সংশ্লিষ্টতা, অভিযোগিত আচরণ, নেতৃত্বের ধরন ও সততার প্রশ্ন তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য অনুপযুক্ত করে তুলেছে।
বিএইচআরডব্লিউ-এর এই উদ্যোগ বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চলমান বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলো কীভাবে এ আবেদনের প্রতি সাড়া দেয়, তা খলিলুর রহমানের প্রার্থিতার ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।