
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিশ্ব জ্বালানি ও বাণিজ্য রাজনীতিতে ভারতের দ্রুত উত্থান এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজস্ব তেল উৎপাদনে বিশ্বে ২৬তম অবস্থানে থাকলেও, পরিশোধিত তেল রপ্তানিতে ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া থেকে কম দামে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা পরিশোধন করে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছে ভারত। এতে একদিকে যেমন দেশটির অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে, অন্যদিকে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ও বাণিজ্য স্বার্থ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির ফলেই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতকে “ক্ষতির প্রজেক্ট” হিসেবে চিহ্নিত করে দেশটির ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন বলে আলোচনা চলছে আন্তর্জাতিক মহলে।
কেন ভারত নিয়ে অস্বস্তি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র–ভারত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে আমেরিকার আমদানির পরিমাণ রপ্তানির চেয়ে বেশি। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র নিজেও বিশ্ববাজারে পরিশোধিত তেল রপ্তানি করে থাকে। কিন্তু রাশিয়া থেকে ডিসকাউন্টেড তেল পাওয়ায় ভারত তুলনামূলক কম খরচে জ্বালানি পরিশোধন করে বাজার দখল করছে, যা মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
এছাড়াও সামরিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান না কিনে রাশিয়ার সু–৫৭ যুদ্ধবিমানের দিকে ভারতের ঝোঁক ওয়াশিংটনের কৌশলগত অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছে।
শুল্ক হুমকি: কৌশল নাকি বাস্তব সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে সামনে রেখে এই শুল্ক হুমকিকে অনেকেই রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখছেন। এর আগেও ট্রাম্প চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে দরকষাকষির পথ বেছে নিয়েছিলেন।
যদিও রাশিয়ার জ্বালানি কেনার অভিযোগে চীন ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোকেও সতর্ক করা হয়েছে, তবে ভারতের ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, চীন ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও ভারতের ক্ষেত্রে এখনো নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করার সুযোগ দেখছে ওয়াশিংটন।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য সুযোগ
ভারতের ওপর বড় ধরনের শুল্ক বা বাণিজ্যিক বাধা আরোপ হলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ কিছু ক্ষেত্রে লাভবান হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে—
তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল
হালকা প্রকৌশল পণ্য
ওষুধ ও কৃষিভিত্তিক পণ্য
এই খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে ভারতীয় পণ্যের বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো, উৎপাদন সক্ষমতা উন্নত করা এবং রপ্তানি নীতিতে বাস্তবসম্মত সংস্কার আনতে হবে।
উপসংহার ভারতের রাশিয়া–নির্ভর জ্বালানি কৌশল তাকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক নতুন বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সংঘাতের সূচনা করেছে। ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি বাস্তবায়িত হোক বা না হোক, এটি স্পষ্ট যে বৈশ্বিক বাণিজ্য আবারও বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। সেই পরিবর্তনের ভেতরেই বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে যেতে পারে।