মোঃ শহিদুল ইসলাম বিশেষ প্রতিনিধিঃ
উন্নয়ন ও সেবায় শূন্যতার প্রভাবঃস্থানীয় সরকার কাঠামোয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতি নগর উন্নয়ন ও নাগরিক সেবায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি রোববার টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে European Union Election Observation Mission–এর দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক সুজান জিন্ডেল এবং সহকারী মো. মাসুক হায়দারের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানান।
মেয়র বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় নগরবাসীর প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে ৪১ জন সাধারণ কাউন্সিলর ও ১৪ জন সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলরের পদ কার্যত শূন্য থাকায় মাঠপর্যায়ে সমস্যা দ্রুত শনাক্ত ও সমাধান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “এত বড় নগরীতে এককভাবে দায়িত্ব পালন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। জনপ্রতিনিধি থাকলে জনগণের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় সহজ হয় এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।”
তিনি উল্লেখ করেন, ২০২১ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার পর আদালতের রায়ের মাধ্যমে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে বলেও তিনি জানান। এতে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও নাগরিক সম্পৃক্ততায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বলে তাঁর অভিমত।
স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতাঃ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওয়ার্ডভিত্তিক জনপ্রতিনিধিরা সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ও আলোকসুবিধাসহ নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন সমস্যাগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন। তাঁদের সক্রিয় উপস্থিতি উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি, সামাজিক সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থায় নীতিগত কার্যক্রম চলমান থাকলেও জনসম্পৃক্ততা ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়।
চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বন্দরনগরী ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হওয়ায় এখানে নগর ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে জটিল। দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত চাপের কারণে একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচিত পরিষদের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গঃমতবিনিময়কালে প্রতিনিধি দল জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কেও জানতে চাইলে মেয়র সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক থাকায় জনগণের প্রত্যাশা বেড়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়েছে এবং উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ইইউ মিশনের বক্তব্যঃ European Union Election Observation Mission–এর প্রতিনিধিরা জানান, বাংলাদেশের জাতীয় আইনি কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে সংসদীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ শেষ হলে একটি বিস্তারিত চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে উপস্থাপন করা হবে এবং তা জনসম্মুখে প্রকাশিত হবে। এতে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সামনে করণীয়ঃবিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান ও স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার অংশ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি না থাকলে উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা দেখা দিতে পারে এবং নাগরিক সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পরিষদ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, স্থানীয় সরকারের শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে নিয়মিত, অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ নির্বাচন অপরিহার্য। নগরবাসীর প্রত্যাশা এখন—দ্রুত নির্বাচন, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।