এম এ আলীম সরকার
শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন হয়ে গেছে। সংঘাত-সংঘর্ষ হয়নি এটা একটি দৃষ্টান্ত। আমরা চাই, নির্বাচিত সরকার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য গণতান্ত্রিক নীতি উদ্ভাবন করে জনজীবনের সমস্যাগুলি সমাধান করে এবং বাংলাদেশকে শ্রমিক পর্যায়ে জনগণের শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাবে। আসলে গণতন্ত্র একটি বিকাশশীল ব্যাপার। ধাপে ধাপে পর্যায়ক্রমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়।
বাংলাদেশে রাজনীতি, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে সুষ্ঠু রাজনৈতিক চিন্তা অল্পই করা হয়েছে। কিছুকাল আগেই রাজনৈতিক নেতারা এবং রাজনৈতিক দলগুলো অত্যন্ত উগ্রভাষায় বক্তব্য প্রকাশ করতেন। এখন সেই উগ্রতা নেই। তবে রাজনৈতিক চিন্তা বিশেষ কোনো অগ্রগতি হয়েছে তাও নয়। রাজনীতি, গণতন্ত্র, জনজীবন এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা ও বিচার বিবেচনা করা দরকার। প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের রাজনীতির চিন্তা ও বিবেচনা অল্পই হয়েছে। রাজনীতির নেতৃত্ব, জনজীবন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা ও বিচার বিবেচনা দরকার। অবস্থার উন্নতি করতে হবে। সবকিছুতেই বিকাশশীলতার মধ্যে বিবেচনা করতে হবে। রাজনীতির নামে যা কিছু চলে আসছে, প্রায় সবকিছু পরিবর্তন করে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন চিন্তা ও কার্যক্রম আরম্ভ করতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতি দারুণভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল।দুর্নীতি পরিহার করার প্রবণতা কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে। সর্বজনীন কল্যাণে রাজনীতির রূপ ও প্রকৃতি নিয়ে পরিচ্ছন্ন ধারণা ও মত প্রচার করতে হবে। রাজনীতিকে যথাসম্ভব দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। দুর্নীতি পরিহার করা ও ন্যায়নীতি অবলম্বন একটা গতিশীল ব্যাপার। রাতারাতি সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে না। সবকিছু ঠিক করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা লাগবে। রাজনীতি হলো জনজীবন পরিচালনার কেন্দ্রীয় চিন্তা ও কার্যক্রম। জনজীবনের ভালো-মন্দ নির্ভর করে জাতীয় রাজনীতির ভালোমন্দের ওপর। রাষ্ট্র হলো জনজীবন পরিচালনার এবং জনকল্যাণকর রূপ দেওয়া ও শক্তিশালী করার চেষ্টা নিরন্তর চালাতে হবে।
বাংলাদেশে বাস্তবে রাজনীতি হয়ে আছে, কথিত রাজনীতিবিদদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও অর্থবিত্ত অর্জনের প্রধান অবলম্বন। প্রকৃতপক্ষে, রাজনীতিবিদদের কার্যক্রমে রাজনীতি খুঁজে পাওয়া যায় না। এই দুর্দশা রাজনীতির অবসান ও সুষ্ঠু রাজনীতির প্রতিষ্ঠা একান্ত দরকার। রাজনীতিতে জনগণেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজনীতির নামে অন্যায়, অবিচার, মিথ্যা ও গণস্বার্থবিরোধী কার্যক্রমের অবসান ঘটাতে হবে। জনগণ নিষ্ক্রিয় না থেকে ন্যায়, কল্যাণ ও মানবতার পক্ষে মত প্রকাশ করলে রাজনীতিবিদদের কার্যক্রম সর্বজনীন কল্যাণের ধারায় চলবে। জনসাধারণ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকলে, কোনোরকম মত প্রকাশ না করলে রাজনীতিবিদদের মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতা দেখা যায়। বাংলাদেশের প্রধান দুর্বলতা রাজনীতিতে সর্বজনীন কল্যাণের চিন্তা নিতান্ত দুর্বল থাকা এবং রাজনীতিবিদদের সুবিধাবাদী কার্যক্রম। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে আত্ম-সমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টা দেখা যায় না। এই রাজনীতি নিয়ে জাতীয় উন্নতি অল্পই সম্ভব। আমাদের জাতীয় জীবনের রাজনীতির দুর্বলতাই প্রধান দুর্বলতা। রাজনীতির উন্নতির জন্য রাজনীতিবিদদের মধ্যে এবং জনসাধারণের মধ্যেও চিন্তাশীলতার বিচার বিবেচনা দরকার। রাজনীতির মান উন্নতিশীল করতে হবে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে এবং জনজীবনে নৈতিক উন্নতিশীলতা অপরিহার্য। এবিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা ও বিচার-বিবেচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।
বাংলাদেশে উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তোলার মতো সবকিছুই আছে। অভাব কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের। এই দুর্বলতার উপলব্ধি রাজনীতিবিদদের মধ্যে এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ও জনজীবনে গড়ে তুলতে হবে। এই ধারায় ও কর্মের নতুন কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার। জনগণের ভিতর থেকে কিছু লোক অগ্রগতির ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমান বাস্তবতায় জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যাপার।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশের রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, আইনের শাসন, বাকস্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচারের আদর্শ। বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরেই একটি কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যাশা করে আসছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বজনীন কল্যাণে রাজনীতি ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোঠায় আসার কারণে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক দলগুলো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
নতুন সরকারের নিকট জনগণের অনেক প্রত্যাশা। বাংলাদেশের জনগণ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ হবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও নিশ্চিত হবে। মুক্ত ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রত্যাশা কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি ন্যায়ভিত্তিক, সর্বজনীন কল্যাণে রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসামুক্ত সম্প্রীতিময় সহনশীলতা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে এই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নিতে পারে। গণতন্ত্রের চর্চা যত গভীর ও বিস্তৃত হবে, ততই বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান উন্নতিশীল সর্বজনীন কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখকঃ এম এ আলীম সরকার : প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তির পার্টি (বিজিপি)।