মো: নাজমুল সাঈদ সোহেল চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী এলাকায় অবস্থিত মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে অবৈধ বসতি স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে বনবিট কর্মকর্তা মুমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে। “চা-পানির খরচ” নামে ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে বনভূমি দখলে সহায়তা করার গুরুতর অভিযোগে ইতোমধ্যে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বনভূমির ভেতরে বসতি নির্মাণের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। বনভূমিতে বসবাসকারী এক রোহিঙ্গা নাগরিক মো. হারেসের স্ত্রীও এমন অভিযোগ করেছেন, যার ভিডিও প্রমাণ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
সরেজমিনে যা দেখা গেল

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দেখা যায়, জাতীয় উদ্যানের বিস্তীর্ণ এলাকায় পাহাড় কেটে সমতল করা হয়েছে। নির্বিচারে গাছপালা নিধন করে গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন বসতি। কোথাও ঝুপড়ি, কোথাও আধাপাকা, আবার কোথাও পাকা স্থাপনা নির্মাণাধীন রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য—গত কয়েক মাসে দখল কার্যক্রম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
সংগঠিত চক্রের দখল বাণিজ্য
স্থানীয় সূত্র জানায়, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দালালের মাধ্যমে আগ্রহীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে জায়গা নির্ধারণ করে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, বনবিট কর্মকর্তার নীরব সমর্থন ছাড়া এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্ভব নয়। “চা-পানির খরচ” দিলেই বাধাহীনভাবে বসতি নির্মাণ করা যায় বলেও দাবি করেছেন একাধিক বাসিন্দা।
এছাড়া প্রতিটি বসতির জন্য আলাদা করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে টার্গেট করে বনভূমিতে বসতি স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
বর্তমানে অন্তত ১০-১২টি পাকা ও আধাপাকা ঘর নির্মাণাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।
টহলে শিথিলতা, আগাম সতর্কবার্তার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের নিয়মিত টহল কার্যক্রমে শিথিলতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দখলকারীদের আগেই সতর্ক করে দেওয়া হয়, ফলে নির্বিঘ্নে চলে নির্মাণকাজ। এতে বন সংরক্ষণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অস্বীকার বন কর্মকর্তার
অভিযুক্ত বনবিট কর্মকর্তা মুমিনুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়নি। একটি চক্র আমার নাম ব্যবহার করে এসব করছে।” তিনি অবৈধ বসতি নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।
‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা!
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার পরপরই আবু তাহের নামের এক ব্যক্তি প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, তিনটি বসতঘরের জন্য প্রায় ১৫ হাজার টাকা উৎকোচ দেওয়া হয়েছে।
উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নীরবতা
বিষয়টি নিয়ে কক্সবাজার উত্তর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মারুফ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিবেশের জন্য বড় হুমকি
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এভাবে সংরক্ষিত বনভূমি দখল চলতে থাকলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাতও বাড়বে।
স্থানীয়দের দাবি
অবিলম্বে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের আশঙ্কা—এখনই পদক্ষেপ না নিলে পুরো মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।

ছবির ক্যাপশন : খুটাখালী মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের জয়গায় গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের বসত বাড়ি।