হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনার পরপরই যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিস্ময় তৈরি করেছে, তা হলো—ঘটনার তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে “হামলাকারী” হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলা। তথাকথিত হামলাকারী ফয়সাল বর্তমানে দুবাই অবস্থান করে একাধিক ভিডিও প্রকাশ করছে, যা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নয়—ভারতের শীর্ষ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলেও রিপিট মুডে সম্প্রচার করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অপরাধের ঘটনায় বিদেশি মিডিয়ার এই অতিসক্রিয়তা কাকতালীয়, নাকি পরিকল্পিত?
গুলির ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই The Dissent নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ফয়সালের ছবি, তার ফেসবুক আইডি এবং এমনকি মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা আরেক সহযোগীর পরিচয় পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়। অথচ সিসিটিভি ফুটেজ ছিল ঝাপসা, মুখ ঢাকা, অস্পষ্ট।
স্বাভাবিক প্রশ্ন—
🔹 পুলিশ যেখানে তখনো নিশ্চিত হতে পারেনি,
🔹 ফরেনসিক বিশ্লেষণ সম্পন্ন হয়নি,
🔹 রাষ্ট্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলো নীরব—
সেখানে একটি ছোট ফেসবুক নিউজ পেজ কীভাবে এত দ্রুত “রিয়েল” আইডি শনাক্ত করে?
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—এই পেজের দেওয়া তথ্য যাচাই ছাড়াই যমুনা টিভি, সময় টিভিসহ দেশের প্রায় সব টেলিভিশন চ্যানেল তা হুবহু প্রচার করেছে। এতে কি গণমাধ্যমের ন্যূনতম ভেরিফিকেশন নীতি লঙ্ঘিত হয়নি?
বাংলাদেশ পুলিশ যদি এই ঘটনার প্রকৃত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে চায়, তবে প্রথমেই প্রশ্ন করতে হবে—
The Dissent পেজের অ্যাডমিন কারা?
তথ্য তারা পেল কোথা থেকে?
তাদের সোর্স কে?
আরও একটি অদ্ভুত অসঙ্গতি জনমনে প্রশ্ন তুলছে। ফয়সালের যে ছবিগুলো ছড়ানো হচ্ছে, সেখানে তার চেহারা একেক ছবিতে একেক রকম। বিশেষ করে তার ভ্রু (eyebrow) খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে অস্বাভাবিকভাবে ঘন হয়ে যাওয়ার কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। তাহলে কি ছবিগুলো এডিটেড? নাকি ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করা হয়েছে?
ফয়সাল নিজে যে ভিডিওগুলো দিচ্ছে, সেখানে সে বারবার একই বক্তব্য দিচ্ছে—“জামায়াত-শিবির মূল আসামি, তারা ছাত্রলীগকে ফাঁসাতে চায়।” প্রশ্ন হলো, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি কীভাবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দায় অন্যের ঘাড়ে চাপায়? আর কেন তার বক্তব্যই হয়ে উঠছে একমাত্র “ন্যারেটিভ”?
চেহারা ভাইরাল হওয়ার পর সে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে—এই দাবিও সামনে আনা হচ্ছে। কিন্তু কেন, কী পরিস্থিতিতে, কার সহযোগিতায়—সে প্রশ্নগুলোর উত্তর কোথায়?
এখানে অতীতের একটি ঘটনার সঙ্গে অস্বস্তিকর মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকেই। কয়েক মাস আগে পাথর দিয়ে একজনকে হত্যার ঘটনায় তারেক রহমান প্রকাশ্যে বলেছিলেন—ঘটনার আগের দিন বাইরে থেকে লোক আনা হয়েছিল বিএনপিকে ফাঁসানোর জন্য। পরে পুলিশও স্বীকার করে যে নিহত ব্যক্তি মূলত বিএনপির কর্মী ছিলেন এবং ঘটনাটি চাঁদাবাজির নয়, বরং ভিন্ন প্রেক্ষাপটের।
তাহলে প্রশ্ন জাগে—
🔹 জামায়াত-শিবিরের নামে ফেসবুকে লাখ টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে ফেইক নিউজ ছড়ানোর অভিযোগের বিচার হলো না কেন?
🔹 এই দুই ঘটনা কি বিচ্ছিন্ন, নাকি একই ছকের পুনরাবৃত্তি?
অনেকের আশঙ্কা, এই ঘটনাগুলো আদতে পরিকল্পিত—একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে বদনাম করা, জনমত প্রভাবিত করা এবং ভোটের সমীকরণ পাল্টানোর জন্য।
একসময় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “আমি জামায়াত-শিবির সাইজ করতে এত ফোর্স লাগিয়ে রেখেছি বলেই দেশের মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারছে।”
আজ প্রশ্ন উঠছে—এই “শান্তি”র ন্যারেটিভ টিকিয়ে রাখতে কি নতুন নতুন রহস্যজনক ঘটনার জন্ম দেওয়া হচ্ছে?
এই সব প্রশ্নের উত্তর না দিলে হাদি হামলা শুধু একটি অপরাধ হিসেবেই নয়—বাংলাদেশের রাজনীতিতে তথ্যযুদ্ধ, মিডিয়া ম্যানিপুলেশন ও বিচারহীনতার আরেকটি উদাহরণ হয়ে থেকে যাবে।
সত্য জানতে হলে তদন্ত হোক—
ফেসবুক পেজ থেকে শুরু করে বিদেশি মিডিয়ার ভূমিকা পর্যন্ত।
নচেৎ রায় আগেই লেখা হয়ে যাবে, তদন্ত হবে কেবল আনুষ্ঠানিকতা।