সংবাদ শিরোনাম
‎যশোরে বিজিবির অভিযানে আড়াই লক্ষ টাকার মাদক ও অবৈধ মালামাল আটক সোসাইটি অব জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনের নতুন কমিটি গঠন মিরপুর শাহ আলী মাজারে হামলার অভিযোগ, নিন্দা জানিয়েছে সুফিবাদ ঐক্য পরিষদ মধ্যস্বত্বভোগী নির্মূলে বড় পদক্ষেপ: যশোরের কৃষকদের সাথে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে কতকিছুর হাট আওয়ামী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের প্রয়ানে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন মহলের শোক আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে ইমাম ও মাংস প্রস্তুতকারীগণের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ডিএনসিসি। হেযবুত তওহীদের গোলটেবিল বৈঠক “মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা” নিশ্চিতে ৯ দফা প্রস্তাবনা উল্টোপথে যানবাহন চলাচল করলেই ডিজিটাল মামলা : ডিএমপি কমিশনার চাঁপাইনবাবগঞ্জে র‍্যাবের বড় অভিযান পৌনে ৭ কেজি হেরোইনসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার গুটিকয়েক মানুষের জন্য পুরো মিরপুরবাসি কষ্ট করবে এটা হতে পারে না-ডিএনসিসি প্রশাসক

*পি আর পদ্ধতির নির্বাচন – প্রাসঙ্গিক ভাবনা*

admin / ৭৮ Time View
Update : শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

35

নিউজ দৈনিক ঢাকার কন্ঠ 

এ কে এম আজিজুর রহমান 

সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) হল একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা যেখানে কোনো দল প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হার অনুযায়ী সংসদে আসন লাভ করে। এফপিটিপি (First-Past-the-Post) ব্যবস্থার বিপরীতে, যেখানে জয়ী হতে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সর্বাধিক ভোটই যথেষ্ট, সেখানে পিআর-এ ছোট দলগুলোরও প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার সুযোগ থাকে। জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ডসহ অনেক দেশে এই পদ্ধতি চালু রয়েছে।

সহজ করে বললে, পি আর বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব হলো এমন একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা, যেখানে সংসদে প্রার্থী বা সদস্য তাঁর দলের মোট ভোটের অনুপাতে নির্বাচিত হন। আর ভোটের অনুপাতের বাইরে প্রথাগত ভোট, যা ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (এফপিটিপি) নামেও পরিচিত । বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচন ব্যবস্থাসহ রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারে বিভিন্ন কমিশন গঠন করা হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের প্রশ্নে অনেক রাজনৈতিক দল আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক

নির্বাচন বা পিআর পদ্ধতিতে ভোটের দাবিও তুলছেন।তবে বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি পুরনো পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবি অব্যাহত রেখেছেন।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থা আলোচনার সূত্রপাত ও ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ এবং রাজনৈতিক বিতর্কের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বাংলাদেশের মূল সংবিধান (১৯৭২) আসলে একটি মিশ্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল। সংবিধানের ৬৫(২) ধারা অনুযায়ী, সংসদের ৩০০ সদস্য থাকবেন প্রত্যক্ষ ভোটে (এফপিটিপি) এবং আরও ১৫ জন (মোট সদস্যের ৫%) মহিলা সদস্য নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের ভোটে (পরোক্ষভাবে একটি আনুপাতিক ধারণা সহ)। তবে এই মহিলা আসনগুলো ছিল সংরক্ষিত এবং দলীয় ভিত্তিতে বণ্টনযোগ্য, যা একটি সীমিত আকারে পিআর-এর মতো কাজ করত। স্বাধীনতার পর একটি দলীয় সরকার জাতিগঠনের কাজ দ্রুত ও দক্ষতার সাথে সম্পাদন করার লক্ষ্যে (পিআর-এর কাছাকাছি) প্রবর্তনের কথা আলোচিত হয়েছিল বলে জানা যায় , যা অবশ্য বাস্তবায়ন হয়নি । তবে তিনি তা চূড়ান্ত রূপ দেননি।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে (১৯৭৮-১৯৮১) পিআর পদ্ধতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। তার সরকার সংরক্ষিত মহিলা আসনের জন্য সরাসরি পিআর পদ্ধতি প্রস্তাব করেছিল, যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি।জেনারেল এরশাদ আমলে পিআর-এর প্রথম প্রবর্তন: রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামল (১৯৮২-১৯৯০) বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় পিআর-এর সবচেয়ে কাছাকাছি অভিজ্ঞতা এনে দেয়।এরশাদ প্রথমে ১৯৮৫ সালের পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলভিত্তিক পিআর পদ্ধতি চালু করেন। ভোটাররা প্রার্থীকে নয়, দলীয় প্রতীককে ভোট দিতেন। দলগুলো তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন করত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনটি সম্পূর্ণভাবে পিআর পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সংসদের ৩০০টি সাধারণ আসন এবং ৩০টি সংরক্ষিত মহিলা আসন—সবই ভোটের অনুপাতে দলগুলোর মধ্যে বণ্টিত হত। প্রধান বিরোধী দলগুলো (তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) এই পদ্ধতির তীব্র বিরোধিতা করে এবং নির্বাচন বয়কট করে। তারা এই পদ্ধতিকে এরশাদকে বৈধতা দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে দেখে। ফলে, এই পদ্ধতির প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি হয়নি এবং এটি একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এই পদ্ধতি বিলুপ্ত হয়। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরে আসার পর থেকে বাংলাদেশ শুধুমাত্র এফপিটিপি পদ্ধতিতে সরাসরি ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচন করে আসছে। সংরক্ষিত মহিলা আসনগুলো সংবিধানের বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু সেগুলোও এখন এফপিটিপি ভিত্তিক দলীয় প্রার্থীদের দ্বারা পূরণ হয় (৩৫০ সদস্যের সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসন)।

জুলাই বিপ্লবের পর পিআর পদ্ধতি আলোচনায় আসে প্রধানত নিম্নোক্ত কারণে : কিছু বড় দল ছাড়া অন্যান্য দলগুলো মনে করে পিআর পদ্ধতি তাদের জন্য সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সৃষ্টি করবে তাছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তন করবে । সুষ্ঠু প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে যুক্তি দেওয়া হয় যে, এফপিটিপি পদ্ধতিতে একটি দল ৫০% ভোটের কম পেয়েও ৮০-৯০% আসন পায়, যা জনমতের সঠিক প্রতিফলন নয়। পিআর-এ নির্বাচন হলে এই সমস্যা কমে আসবে।

তবে প্রথাগতভাবে বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে ভোট দিয়ে অভ্যস্ত, তাতে তাঁরা তাঁদের পছন্দমতো প্রার্থীদের সরাসরি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে পছন্দ করেন। পিআর পদ্ধতিতে একজন ভোটারের সেই স্বাধীনতা থাকে না। এখানে ব্যক্তির পরিবর্তে দলকে ভোট দিতে হয়, যেখানে দল পরবর্তী সময়ে প্রার্থী নির্বাচন করার প্রক্রিয়ায় থাকে।

যদিও কোনো কোনো দেশে একটি মিশ্র পদ্ধতির প্রচলন আছে, সেখানেও প্রার্থীর সঙ্গে জনগণের যে প্রথাগত যোগাযোগ থাকে, পিআর পদ্ধতিতে তা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জনগণ রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। প্রস্তুতিহীন অবস্থায় সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার প্রচলন এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং ভোটারদের মধ্যে আস্থার অভাব গড়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশে পিআর পদ্ধতির আলোচনার ইতিহাস মূলত ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রতিনিধিত্বের ন্যায্যতা, এবং রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার এক জটিল সমীকরণ। যে কোনো সরকারের জন্যই এফপিটিপির বিকল্প হিসেবে পিআর বা মিশ্র-পদ্ধতি বিবেচনা করা একটি সুচিন্তিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category