রাজধানীর প্রসারমান অঞ্চল উত্তরা ও তুরাগ আজ এক নীরব মহামারির মুখে দাঁড়িয়ে। উন্নয়ন, আবাসন ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের আড়ালে অদৃশ্যভাবে বিস্তার লাভ করছে মাদক ব্যবসা। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন—নানামুখী মাদকের দাপটে বিপন্ন হয়ে পড়ছে তরুণ প্রজন্ম। সমাজের ভবিষ্যৎ আজ প্রশ্নের মুখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টর, পুকুরপাড়, তাঁরাটেক, আহালিয়া, পাকুরিয়া, হাসুর বোতলা, বালুর মাঠসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে বা আড়ালে মাদক লেনদেন চলছে। তুরাগ থানার অধীন একাধিক মহল্লায় সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। কোথাও নারী-পুরুষ মিলিতভাবে কারবার চালানোর অভিযোগও রয়েছে। প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকার মাদক হাতবদল হচ্ছে—এমন কথাও শোনা যাচ্ছে স্থানীয়দের মুখে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই বিষবাষ্পে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর-কিশোরী ও তরুণরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী হওয়ার কথা যাদের, তারা আসক্তির ফাঁদে পড়ে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুয়া ও অনলাইন বেটিংয়ের বিস্তার, যা মাদকের অর্থচক্রকে আরও শক্তিশালী করছে।
সরকার ইতোমধ্যে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—অভিযান কি যথেষ্ট নিয়মিত ও গোয়েন্দাভিত্তিক? গ্রেপ্তারের পর কতজন প্রকৃত গডফাদার আইনের আওতায় আসে? কেন বারবার একই এলাকায় একই অভিযোগ ফিরে আসে?
মাদক একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক অবক্ষয়ের সঙ্গে জড়িত একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে প্রয়োজন—
প্রথমত, নিয়মিত ও হঠাৎ সমন্বিত অভিযান, যেখানে থানা পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর একযোগে কাজ করবে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও কমিউনিটি নেতাদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
তৃতীয়ত, তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—কারণ ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙা না গেলে কেউ মুখ খুলবে না।
চতুর্থত, মাদকাসক্তদের জন্য পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। কেবল গ্রেপ্তার নয়, পুনর্বাসনই হতে পারে টেকসই সমাধান।
আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক কঠোরতার সমন্বয়। উত্তরা–তুরাগে যদি প্রতিটি অলিগলিতে নজরদারি বাড়ানো হয়, নিয়মিত টহল ও প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং চালু করা হয়, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
আমরা ভুলে যেতে পারি না—মাদক কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবারকে ধ্বংস করে; একটি পরিবার ধ্বংস হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। তাই এই লড়াই কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয়; এটি আমাদের সবার।
উত্তরা–তুরাগের আকাশে যেন আর কোনো তরুণের স্বপ্ন পুড়ে না যায়—এটাই হোক প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত অঙ্গীকার। এখনই সময়, নীরবতা ভেঙে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। অন্যথায় এই নীরব মহামারি একদিন আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার নির্মম দলিল হয়ে থাকবে।