শেরপুর বগুড়া প্রতিনিধি
বৃহস্পতিবার ২৭/০২/২০২৫ ইং
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বিনোদপুর গ্রাম দুই কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশায় পেশা হারানোর শঙ্কায় ৭শ’ পরিবার।
দৈনিক আড়াই থেকে তিনহাজার চাঁটাই তৈরি হয় এ গ্রামে। রাস্তার দোহাই দিয়ে ফড়িয়ারা দাম কমান।
ষাটোর্ধ্ব বয়সের আ. রশিদ ৪০ বছর ধরে বাঁশশিল্পের অন্যতম চাঁটাই (স্থানীয় ভাষায় তালাই) তৈরী করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের বিনোদপুর গ্রামে তার বসবাস। আ. রশিদের মতই এই গ্রামের বাসিন্দারা বংশ পরম্পরায় এ কাজের সাথে জড়িত। কিন্তু, দুই কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশায় তারা এখন পেশা হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। এবং
সরেজমিনে, ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের মির্জাপুর বাজার থেকে বাইপাস সড়কের প্রায় চার কিলোমিটার পূর্বে সুঘাট ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত বিনোদপুর গ্রাম। বাঙালি ও করতোয়া নদী বিধৌত গ্রামটিতে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার ধারে, বাড়ির আঙিনায়, বারান্দায়, গাছের নিচে বসে চাঁটাই তৈরির কাজ করছেন নানা বয়সী মানুষ। এ গ্রামের ৭শ’ পরিবার চাঁটাই তৈরির কাজের সঙ্গে জড়িত। ছোটখাটো ক্ষেত-খামারের কাজে জড়িত থাকলেও বছরের বেশির ভাগ সময় তারা চাঁটাই তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকেন। সকাল থেকে রাত অবধি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পরিবারের ছোট বড় ছেলে-মেয়েদের এ কর্মযজ্ঞ চলতে থাকে সমান তালে। তাদের মধ্যে অনেকে ডোল, মাছ ধরার বিভিন্ন সামগ্রী, হোচা, ঝুড়ি, কুলা তৈরি করলেও অধিকাংশই বিভিন্ন মাপের নানা ডিজাইনের চাঁটাই তৈরি করেন। কারণ, ধানের গোলা তৈরী, মৃত ব্যক্তির লাশ দাফন, ভবন নির্মাণ, বিছানাসহ নানা কাজে চাঁটাইয়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা বাঁশ কিনে এনে কাটার কাজ করেন। অন্যদিকে, বেতি তৈরি করাসহ চাঁটাই তৈরীর কাজ করেন এসব বাড়িতে বউ হয়ে আসা নারীরাও। একটি ভাল মানের (তল্লা বাঁশ) থেকে ২-৩ টি চাঁটাই বানানো যায়। একজন শ্রমিক সারাদিনে ৩-৪ টি চাঁটাই তৈরী করতে পারেন। এ গ্রাম থেকে দৈনিক আড়াই থেকে তিনহাজার চাঁটাই কিনে নিয়ে যান পাইকার ও ফড়িয়ারা।
চাটাই তৈরীর প্রধান উপকরণ তল্লা বাঁশ কেনা হয় শেরপুর উপজেলার ঘোলাগাড়ি, মির্জাপুর, চান্দাইকোনা এবং সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, তাড়াশসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। বাঁশের তৈরি এসব চাঁটাই জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও ফরিদপুর, পাবনা, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জসহ আশেপাশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা কিনে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করেন।
গ্রামের বাসিন্দারা জানান, সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এ চাঁটাই কিনতে পাইকাররা বাড়ি বাড়ি আসেন। কিন্তু, শহিদ বাসস্ট্যান্ডের উত্তরপাশ থেকে বিনোদপুর গ্রামের প্রবেশ মুখ পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তার বেহাল দশার কারণে পাইকাররা বাঁশের তৈরী এসব পণ্য কিনতে আগ্রহ কম দেখাচ্ছেন। রাস্তার দোহাই দিয়ে ফড়িয়ারাও কমদামে কিনতে চান। এরফলে, পেশা হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন ৭শ’ পরিবার। উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের বিনোদপুর ছাড়াও আশপাশের তালপট্টি, কাশিয়াবালা, চকসাদী, মাঝিপাড়া, জোড়গাছা, কল্যাণী, সীমাবাড়ী, নাকুয়া গ্রামের প্রায় ৫ হাজার মানুষ এ পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন। তবে, বিনোদপুর গ্রামের রাস্তা সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
চাঁটাই তৈরী করে সংসার চালানো আ. রশিদ বলেন, ‘৩ যুগের বেশী সময় ধরে এ কাজে জড়িত আছি। দুই কিলোমিটার কাচা রাস্তার কারণে বাঁশ কিনে আনতে আমাদের খরচ বেশী হয়ে যায়। সারাদিন খেটেও লাভের অংশ থাকেনা বললেই চলে। দুই কিলোমিটার রাস্তা পাকা করার জন্য কতজনকে বললাম! কোন ফল পাইনি। রাস্তার এমন অবস্থা যে, এখানে পায়ে হেঁটে চলাও কঠিন। রাস্তার জন্য মনে হয় জীবিকার পথটাই বন্ধ হয়ে যাবে।’
চাঁটাই কিনতে আসা পাইকার হাবিব বলেন, ‘যদি ট্রাক নিয়ে সরাসরি এ গ্রামে আসা যেত তাহলে, আমাদের খুব সুবিধা হতো। এখান থেকে ভটভটিতে করে পণ্য নিয়ে গিয়ে আবার ট্রাকে লোড করতে হয়; এতে করে আমাদের পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যায়। দুই কিলোমিটার রাস্তার অভাবে এখন ব্যবসা টিকে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
জানতে চাইলে শেরপুর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মোঃ আব্দুল মজিদ বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব রাস্তাটি সস্কারে সকল ধরণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’