সংবাদ শিরোনাম
সত্যের মঞ্চ না রাজনৈতিক অঙ্গন?সাংবাদিকতা ও রাজনীতির সীমারেখা নিয়ে নতুন বৈশ্বিক ভাবনা রাজশাহীতে বিপিডব্লিউএন কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আলোচনা সভা ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত রাজপথের ‘খড়কুটো’ বনাম ক্ষমতার হালুয়া-রুটি: কর্মী, তোমার বিবেক জাগবে কবে? নিকুঞ্জ থেকে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা রবিন হোসেন রাহাত আটক নিউইয়র্কে ডেন্টিস্ট্রিতে এমএস সম্পন্ন করলেন ডা. উম্মে রুম্মান সেজুতি প্রাথমিক শিক্ষকদের ভোগান্তি কমাতে বদলি প্রক্রিয়ায় বড় সংস্কার: প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ অন্যায়ের মুখে অবিনাশী কলম ঢাকা-আঙ্কারা অক্ষ: দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ নিরাপদ খাদ্য, কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতের প্রত্যয়ে এক ভিন্নধর্মী উদ্যোগ সাংস্কৃতিক শিক্ষা নতুন প্রজন্ম গঠনের অপরিহার্য অংশ: প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ

ঋণ শোধের এমন প্রতিদান? ভারত-পাকিস্তান-নেপাল পেল ফ্রি ভিসা, বাংলাদেশ বঞ্চিত! আমাদের কূটনীতি কি তবে ঘুমিয়ে?

admin / ৬৪ Time View
Update : বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬
Oplus_16908288

88

নিউজ দৈনিক ঢাকার কন্ঠ 

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান।

কূটনৈতিক ব্যর্থতার এক নতুন ট্র্যাজেডি ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে শ্রীলঙ্কা বিশ্বের ৪০টি দেশের নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে ৩০ দিনের অন-অ্যারাইভাল ট্যুরিস্ট ভিসা (ইটিএ) চালু করেছে। বৈশ্বিক পর্যটন ও নিজেদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে লঙ্কান সরকারের এই মহাপরিকল্পনার তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, চীন ও জাপানের মতো দেশ। অর্থাৎ, দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত প্রায় সব দেশের নাগরিকরাই এখন শ্রীলঙ্কায় বিনা ভিসায় পা রাখতে পারছেন।

কিন্তু অত্যন্ত রহস্যজনক ও দুঃখজনকভাবে, এই তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। এটি কোনো সাধারণ ভিসা নীতির পরিবর্তন নয়; এটি আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা, কূটনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব এবং চরম জবাবদিহীনতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

বন্ধুর প্রতিদান যখন কূটনৈতিক অপমান!

ইতিহাসের খাতা উল্টে দেখা যাক। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা যখন ইতিহাসের ভয়াবহতম অর্থনৈতিক সংকটে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম, তখন বাংলাদেশ বুক ফুলিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আন্তর্জাতিক কূটনীতির সব নিয়ম ভেঙে, পরম বন্ধুর মতো ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কারেন্সি সোয়াপ সুবিধা দিয়েছিল ঢাকা। লঙ্কানরা সেই দুঃসময়ের ঋণ পরবর্তীতে পরিশোধ করলেও, বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে বাংলাদেশের এই উদারতা ছিল এক বিরল দৃষ্টান্ত।

তাত্ত্বিকভাবে, এমন অকৃত্রিম বন্ধুত্বের প্রতিদান হিসেবে ফ্রি ভিসার তালিকায় বাংলাদেশের নাম প্রথম সারিতে থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো চিত্র। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দরকষাকষির অভাব, পূর্বপ্রস্তুতির অনুপস্থিতি এবং উদাসীনতার কারণে বাংলাদেশ কেবল একটি সুবিধাই হারায়নি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।

এক নজরে পাসপোর্টের করুণ দশা:

হেনলি অ্যান্ড পার্টনারসের ২০২৬ সালের সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীরা অগ্রিম ভিসা ছাড়া বিশ্বের মাত্র ৩৭টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন। সূচকে সামান্য ওলটপালট হলেও (বর্তমানে ৯৫তম), দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পাসপোর্টের মান বৈশ্বিক সর্বনিম্ন স্তরেই আটকে আছে। প্রতিবেশীরা যখন আকাশ ছুঁইছে, আমাদের পাসপোর্ট তখন তলানিতে।

আফ্রিকার অপার সম্ভাবনা: অবহেলা আর হেলাফেলার কূটনীতি

এই কূটনৈতিক অদক্ষতা শুধু শ্রীলঙ্কাতেই সীমাবদ্ধ নয়; আফ্রিকা মহাদেশের অপার সম্ভাবনাকে বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে হেলাফেলা করে আসছে। বিশেষ করে পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে আমাদের কোনো সুনির্দিষ্ট ভিশন বা রোডম্যাপ নেই।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ সোমালিয়া। দেশটিতে একজন বিদেশির বার্ষিক ভিসা ফি ১,৮০০ মার্কিন ডলার এবং কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন নবায়ন ফি বছরে ৩,০০০ ডলার। অথচ সুদান বা ইয়েমেনের মতো মুসলিম দেশের নাগরিকরা সেখানে নামমাত্র ফিতে ব্যবসা এবং বিনা ফিতে বসবাসের সুযোগ পাচ্ছেন। সোমালিয়ার মানুষ বাংলাদেশকে মনেপ্রাণে ভালোবাসে। সেখানে একটু কার্যকর কূটনৈতিক হাত বাড়ালেই আমাদের ব্যবসায়ীদের জন্য লক্ষ-কোটি ডলারের বাণিজ্যের দুয়ার খুলে যেত। অথচ পূর্ব আফ্রিকায় নিযুক্ত আমাদের মিশনগুলো সম্ভবত জানেই না সেখানে কী বিপুল সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে!

ভিসা জটিলতার কারণে সোমালিয়ার হাজার হাজার শিক্ষার্থী বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আসতে পারছে না। অথচ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এলে আমাদের শিক্ষার মান ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ—দুটিই বাড়ত। সোমালিয়া, উগান্ডা, কেনিয়া, রুয়ান্ডা, তানজানিয়া ও ইথিওপিয়া আমাদের তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং কৃষিপণ্য রপ্তানির এক বিশাল খনি। কিন্তু আমাদের মিশনগুলোতে এখনো সেই পুরোনো আমলাতান্ত্রিক রোগ বিরাজমান—‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা পরাবে কে?’

নতুন নেতৃত্বের সামনে কঠিন challenge

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা নতুন সরকার তাদের প্রাথমিক ‘হানিমুন পিরিয়ড’ সফলভাবে পার করেছে। সরকার প্রধানের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা দেশবাসীকে আশাবাদী করে তুলেছে। তবে শুধু মুখের কথায় নয়, এখন সময় এসেছে পরিমাপযোগ্য কাজের অগ্রগতি দেখানোর। এই মুহূর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ:

বিগত আমলের দোসরদের অপসারণ: বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের অনেক মিশনে এখনো বিগত ফ্যাসিবাদের দোসর ও সুবিধাভোগীরা জেঁকে বসে আছে। তারা হয় দেশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় চক্রান্ত করছে, না হয় ফাইল চাপা দিয়ে অলস সময় পার করছে। এদের দ্রুত অপসারণ করা জরুরি।

নতুন মন্ত্রিত্বের অগ্নিপরীক্ষা: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন মন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। পুরো মন্ত্রণালয়কে আমূল ঢেলে সাজানোর এটাই তাদের উপযুক্ত সময়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংস্কারে জরুরি রোডম্যাপ

দেশকে এই diplomatic স্থবিরতা থেকে বাঁচাতে হলে এখনই কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিতে হবে:

অর্থনৈতিক কূটনীতি চালুকরণ: প্রতিটি দেশের দূতাবাসে শুধু প্রথাগত ফাইল চালাচালি নয়, ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’ (Economic Diplomacy) বাধ্যতামূলক করতে হবে।

আফ্রিকায় নতুন মিশন স্থাপন: আফ্রিকা মহাদেশের বাণিজ্যিক হাবগুলোতে (বিশেষ করে সোমালিয়া, উগান্ডা, রুয়ান্ডা) দ্রুত পূর্ণাঙ্গ মিশন চালু করতে হবে।

দ্বিপক্ষীয় ভিসা চুক্তি: শ্রীলঙ্কাসহ যেসব দেশ আমাদের বন্ধু, তাদের সাথে অন-অ্যারাইভাল ও ফ্রি-ভিসা সুবিধা চালুর জন্য জরুরি টেবিল বৈঠক শুরু করা।

পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য (KPI) নির্ধারণ: প্রতি বছর একটি মিশন কতটুকু বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়াল, কতটি দেশের সাথে ভিসা চুক্তি সহজ করল—তার ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রদূতদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

আর কতকাল এই নীরব পরাজয়?

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সেই লাইনের মতো—‘মায়ের দরদ’ দিয়ে ঝড়ের রাতে আম কুড়ানোর মতো নিবেদিতপ্রাণ ও দেশপ্রেমিক মানুষ আজ আমাদের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে কোথায়?

ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ফ্রি ভিসা পেয়ে গেল, আর আমরা ২০০ মিলিয়ন ডলার ধার দিয়েও বঞ্চিতের তালিকায়! আফ্রিকার বিলিয়ন ডলারের বাজার আমাদের চোখের সামনে হাতছাড়া হচ্ছে। এটি আর কেবল ভিসা না পাওয়ার গল্প নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের নীতিগত পরাজয়ের নগ্ন রূপ।

সরকার কি এখনো জেগে ঘুমাবে, নাকি এই নীরব কূটনৈতিক পরাজয়ের বৃত্ত ভেঙে এক নতুন, আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণে গর্জে উঠবে? দেশবাসী আর অজুহাত চায় না, কাজের পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি দেখতে চায়।

লেখকঃ

ভাইস চ্যান্সেলর, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোগাদিসু, সোমালিয়া ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category