আকিকুর রহমান রুমন:-
হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক তালিকায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম বাদ দিয়ে প্রনোদনার চুড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে ইউনিয়ন বিএনপি
(সভাপতি)সহ অন্যান্য নেতাদের নিকট আত্বীয় স্বজন ও তাদের পরিবারের সদস্য ছাড়াও বিভিন্ন ধন্যাঢ্য ব্যাক্তি এবং প্রবাসীদের নাম। এই ঘটনায় প্রান্তিক কৃষক ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
এসব বিষয়ের উপর এক অনুসন্ধানে দেখা যায়,হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলায় গত (এপ্রিল)মাসে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে আবাদকৃত হাজার হাজার হেক্টর বৈশাখী কৃষি জমি পানিতে তলিয়ে যায়।এতে ব্যাপক লোকসানে পড়েন ১৫টি ইউনিয়নের হাজারো প্রান্তিক কৃষকেরা।
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বেশ ফলাও করে সংবাদ প্রচারিত হয়। পরে সরকারি নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে বানিয়াচং উপজেলা কৃষি বিভাগ। কিন্তু সেই তালিকায় কোন অদৃশ্য শক্তির ইশারা ও নির্দেশে সেই সব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম বাতিল করা হয়।
উপজেলা প্রশাসন এর একটি সূত্র জানান,পুনঃরায় স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ইউপি সদস্যদের নিয়ে ৮ হাজার ৭শত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করে কৃষি বিভাগ। এর মধ্যে ১৫টি ইউনিয়নে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কৃষকের নাম প্রণোদনার তালিকায় সরকারি ভাবে অনুমোদন পায়।
ইতিমধ্যে ১৫টি ইউনিয়ন পরিষদে প্রনোদনার অর্থ ও চাল বিতরণের তালিকা প্রেরণ বানিয়াচং উপজেলা কৃষি বিভাগ। প্রেরিত তালিকাটি প্রকাশের পর পরই শুরু হয় উপজেলা জুড়ে তীব্র আলোচনা সমালোচনা। এবং সরকারি তালিকায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম বাদ দিয়ে বিএনপি নেতাদের পরিবারের সদস্য ও ধন্যাঢ্য ব্যাক্তি বর্গের হাজার হাজার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শুধু তাই নয়, তালিকায় অ-কৃষক নারী-পুরুষদের পাশাপাশি প্রবাসীদের নাম ও স্হান পেয়েছে। এমনকি অসংখ্য প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের নাম ও এসব প্রনোদনার চুড়ান্ত তালিকায় প্রকাশ পেতে দেখা যায়।
এসব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক তালিকায় বানিয়াচং উপজেলা সদরের ১নং উত্তর পূর্ব ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবুল মিয়ার পুত্র স্হানীয় সংসদ সদস্য(এমপি’র)
দাপ্তরিক সম্পাদক কাজে নিয়োজিত সাদিক মিয়ার পরিবার ও আত্বীয় স্বজনের ৯ সদস্যের নাম অন্তর্ভুক্ত তালিকাটি প্রকাশ হওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম “ফেইসবুক”এর মাধ্যমে দেশ-বিদেশ থেকে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদে সরগরম হতে দেখা যায়।তখন এই বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন স্থানীয় সংসদ সদস্য’র দাপ্তরিক কাজে নিয়োগকৃত সাদিক মিয়া।
পড়ে সাদিক মিয়া নিজেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার”ফেইসবুক” আইডি থেকে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলে সবাইকে বুঝানোর চেষ্টা করেন।
সাদিক মিয়া তার “ফেসবুক”লাইভে এসব নামের বিষয়ে সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন,এখানে শুধু তার পিতা ও তার ভাইয়ের নামটি ফটোকার্ড করে মিথ্যা ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। তাছাড়া অন্যান্য যে সকল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম প্রকাশ পেয়েছে তালিকায়। তারা তার আত্বীয় স্বজন এটা সঠিক। কিন্তু তারা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এবং তারা এই প্রনোদনার হক পাওনাদার বলেও উল্লেখ করেন।
অপরদিকে তার এলাকাবাসী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকগন সহ অন্যান্য লোকজন জানান,যাদের নাম রয়েছে তালিকায় আপনারা তদন্ত করে দেখুন তাদের ১কানা জমিজমা রয়েছে কিনা এবং কৃষি জমি করে তাদের ক্ষতি হয়েছে কিনা। তাদের বিন্দু পরিমাণ ও এসব কোন কিছু নেই।
বরং সাদিক মিয়া নিজে হাওরের কৃষি জমিতে পানি দেওয়ার কাজ করে আসছে হাওরের একটি অংশ জুড়ে।যেটি প্রজেক্ট হিসাবে সম্বোধন করে থাকেন কৃষকগন। এছাড়াও বানিয়াচং উপজেলা সদরের ৩নং দক্ষিণ পূর্ব ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দিন।
সম্প্রতি আবারো ৩নং দক্ষিণ পূর্ব ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি ও সাবরেজিস্টার অফিসের দলিল লেখক মোঃ ছামির মিয়ার পরিবারের আপন ছোট্ট ভাই, ভাতিজা,বোন জামাতা,শ্যালিকা সহ বেশ কয়েকজন সদস্যের নাম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় প্রকাশ পায়।
এরপর পুনঃরায় এই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাথে প্রতারণা করার বিষয়টি নিয়ে এলাকায় তীব্র আলোচনা সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি ৩নং দক্ষিণ পূর্ব ইউনিয়নের প্রান্তিক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা বলেন, প্রণোদনার চুড়ান্ত তালিকার ১১৪ নং ক্রমিকে বিএনপি ইউনিয়ন সভাপতি ছামির মিয়ার আপন ছোট ভাই সিরফল মিয়া,
৫৯ নং ক্রমিকে আপন বোন আয়মনা বিবি, ৭৫নং ক্রমিকে আপন বোন জামাতা শরীফ উল্লা,৫৫ নং ক্রমিকে আপন ভাতিজা সিজিল এবং ৮০ নং ক্রমিকে আপন শ্যালিকা হোসনা বেগমের নাম রয়েছে। প্রত্যেকেই এলাকার ধন্যাঢ্য মানুষ হিসাবে পরিচিত। এমনকি তারা কখনোই কৃষি কাজে সম্পৃক্ত নন বলেও জানান তাদের প্রতিবেশী গন।
এমনকি ২নং উত্তর পশ্চিম ইউনিয়নেও ১০০নং ও ১৪৭নং ক্রমিকে ২বছর যাবৎ প্রবাসে বসবাসরত কৃষক ছাড়াও কৃষিতে জড়িত নন এমন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক রয়েছেন অহরহ।এসব বিষয়ে অসংখ্য প্রান্তিক ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও বিভিন্ন ইউপি’র দায়িত্বরত জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলাপ কালে তারা জানান,উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নেই সঠিক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাথে এক প্রকার প্রতারণা করেছেন দায়িত্বরতগন।
কারণ তাদের প্রকাশিত তালিকার মধ্যেই ব্যাপক অনিয়ম এর প্রমাণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। কিন্তু দায়িত্বে নিয়োজিত যারা রয়েছেন তারা প্রকৃত কৃষকদের নাম গুলো বাতিল করে বিএনপি নেতার ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন ধন্যাঢ্য ব্যাক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে তাদের দায়িত্বের উদাসীনতা করে এক কৃষকদের সাথে প্রতারণা করে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
তাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবী, এই ভাঁওতাবাজি ও প্রতারনাকারী অ-কৃষকদের নারী-পুরুষ এবং প্রবাসীদের ভূয়া নামের তালিকাটি বাতিল করে পুণঃ তদন্তের দাবি জানিয়ে এবিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।
এ ব্যাপারে বানিয়াচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এনামুল হক এর সাথে মুঠোফোন যোগাযোগ করে কোন সাড়া না পাওয়ায় সরকারি নাম্বারের হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা প্রেরণ করে রাখলেও তিনি এরিপোর্ট লেখা কালীন সময় পর্যন্ত কোন কিছু জানান নাই বলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয় নাই। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও জনপ্রতিনিধি সূত্রে জানান,এমন প্রতারণা ও দূর্নীতির বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ব্যানারে আগামীকাল ৭জুন(রবিবার)
সকালে বানিয়াচং উপজেলা সদরের বড়বাজার সাবরেজিস্টার অফিসের সামনে এক প্রতিবাদ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।