চৈত্র সংক্রান্তি হলো বাংলা সনের শেষ মাস চৈত্রের শেষ দিন (সাধারণত ১৩ বা ১৪ এপ্রিল), যা পুরাতন বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে (পহেলা বৈশাখ) বরণের উৎসব ২, ৩। এটি বাঙালির একটি লোকউৎসব ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব, যা গ্রামীণ জীবনে চড়ক পূজা, মেলা, শিবের গাজন, বাসি বিয়ে, নানাবিধ শাক-সবজি খাওয়ার উৎসব হিসেবে পালিত হয় ।
চৈত্র সংক্রান্তি তারিখ ৩০ চৈত্র বাংলা সনের চৈত্র মাসের শেষ দিন, যা পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছর—পহেলা বৈশাখকে বরণ করার এক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বাঙালি লোকউৎসব। যুগ যুগ ধরে এই দিনটি বাঙালির কৃষিভিত্তিক সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
ঐতিহাসিকভাবে চৈত্র সংক্রান্তির উৎপত্তি প্রাচীন বাংলার কৃষি সমাজে। বছরের শেষ দিনে প্রকৃতির কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং নতুন বছরের ভালো ফসলের আশায় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালিত হতো। বিশেষ করে হিন্দু সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই দিন শিবপূজা ও গাজন উৎসবের মাধ্যমে মহাদেবের আশীর্বাদ কামনা করেন।
চৈত্র সংক্রান্তির অন্যতম আকর্ষণ হলো শিবের গাজন ও চড়ক পূজা। শৈব সম্প্রদায়ের ভক্তরা বিভিন্ন ব্রত ও তপস্যার মাধ্যমে এই উৎসব উদযাপন করেন। চড়ক পূজায় ভক্তরা চড়ক গাছে ঝুলে আত্মত্যাগের প্রতীকী নিদর্শন তুলে ধরেন, যা দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের অংশ।
এদিন গ্রামবাংলায় বসে বর্ণিল মেলা। নানা ধরনের লোকজ পণ্য, খেলনা, মিষ্টান্ন ও ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর সমাহারে মেলা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। সংক্রান্তির আগের দিন ‘নীল পূজা’ এবং পরদিন শিব-গৌরী সেজে গান, নৃত্য ও সংযাত্রা পরিবেশন করা হয়, যা বাঙালির লোকসংস্কৃতির এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
খাদ্যসংস্কৃতিতেও রয়েছে বিশেষত্ব। চৈত্র সংক্রান্তিতে তিতা শাকসহ নানা ধরনের তিতা খাবার খাওয়ার প্রচলন আছে, যা শরীর শুদ্ধি ও সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেকেই এই দিনে পবিত্র স্নান, দান-ধ্যান ও পূণ্যকর্মের মাধ্যমে মঙ্গল কামনা করেন।
সময়ের পরিবর্তনে নগরজীবনে এই উৎসবের কিছুটা রূপান্তর ঘটলেও গ্রামবাংলায় এখনও চৈত্র সংক্রান্তির ঐতিহ্য অটুট রয়েছে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় বা লোকজ অনুষ্ঠান নয়, বরং বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
চৈত্র সংক্রান্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে নতুনকে বরণ করার মধ্যেই জীবনের চিরন্তন সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।