সংবাদ শিরোনাম
লোডশেডিংয়ে জনজীবন হাঁসফাঁস সারাদেশে বিদ্যুৎ সংকট, গ্রাম-শহরে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বাবা-মায়ের কবরে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা গুমের শিকার ব্যক্তিদের সরাসরি ন্যায়বিচারের পথ সুগম করেছে প্রস্তাবিত আইন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৫০% পেনশন সমর্পণকারীদের ১০ দফা দাবি সমর্পিত অর্থ ফেরতসহ বৈষম্য নিরসনে দ্রুত নীতি প্রণয়নের আহ্বান ঢাকা ১৮ আসনের মাননীয় সাংসদ জনাব এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন সাহেব এর সাথে উত্তরা কম্পিউটার সমিতির সভাপতি বেলাল মোল্লা মেহেদী র নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের শুভেচ্ছা বিনিময়। এ সময়ে উত্তরা কম্পিউটার সমিতির সদস্য দের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়। সাংসদ উত্তরা কম্পিউটার ব্যবসায়ীদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তুরাগবাসীসহ দেশবাসীকে আব্দুর রহমান বুলুর শুভেচ্ছা  দক্ষিণখানে ৯ বছরের শিশু ধর্ষণের অভিযোগ, আসামি গ্রেফতার মামলা তুলে নিতে শিশুটির পরিবারকে হুমকির অভিযোগ স্পার সাইনবোর্ডে আড়ালের ব্যবসা? গুলশানে শাহ আলম-রাজুর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, তদন্তের দাবি পশ্চিম আইনুছবাগ হাউস ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত কমিটির পরিচিতি সভা বাড়ি-ফ্ল্যাট ও জমির মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় উত্তরা মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামলার অভিযোগ, আহত পরিচালকসহ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা

ধানের মৃত্যুতে মানুষের বিসর্জন

admin / ৭৭ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

প্রকাশ ঢাকায় কন্ঠ 

— মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

আকাশের মুখ ভার ছিল সেই কাকডাকা ভোর থেকেই। মেঘগুলো যেন কেবল জলকণা বয়ে আনছিল না, বরং কোনো এক আসন্ন মহাপ্রলয়ের বিষাদভার বহন করছিল। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল তখন গ্রাস করতে শুরু করেছে হাওরের বুক।

নদীগুলোর ধমনী ফুলে ফেঁপে একাকার। দূরে দিগন্তরেখায় আকাশ আর জল মিশে তৈরি হয়েছে এক ধূসর ক্যানভাস। বাতাসে কাঁচা ধানের ঘ্রাণ আর আর্দ্র মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে ছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা—যেন কোনো এক অশুভ সংকেত প্রকৃতি তার নিশ্বাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের কাইশ্যা বিলের পাড়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন আহাদ মিয়া। তার সামনেই ধূ ধূ করছে ছয় বিঘা জমি। এই সামান্য ভূখণ্ডই ছিল তার আটপৌরে জীবনের একমাত্র মহাকাব্য। এই জমির পলিমাটির নিচেই চাপা পড়ে ছিল মেয়ের বিয়ের গহনার স্বপ্ন, ছেলের কলেজের রঙিন দিনগুলো, অসুস্থ স্ত্রীর ওষুধের শিশি আর এনজিওর ঋণের কিস্তির সেই অবধারিত দুশ্চিন্তা।

পঞ্চাশ পেরোনো আহাদ মিয়ার শরীরে শ্রমের ছাপ স্পষ্ট—রোদে পোড়া তামাটে চামড়া, কপালে গভীর ভাঁজের মানচিত্র, আর চোখে অদম্য বেঁচে থাকার লড়াই। তিনি সারাজীবন বিশ্বাস করে এসেছেন—“মাটি কখনো বেইমানি করে না।” শ্রমের ঘাম যদি ঠিকমতো মাটিতে মেশানো যায়, তবে মাটি তার প্রতিদান দেবেই।

এবার প্রকৃতিও যেন দুহাত ভরে দিয়েছিল। পাকা ধানের সোনালি ঢেউ যখন হাওরের বাতাসে দোল খেত, আহাদ মিয়া দূর থেকে সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে বিভোর হতেন। মনে মনে অংকের ছক কাটতেন—এইবার বুঝি ঘুরে দাঁড়ানো যাবে, এইবার বুঝি অভাবের সাথে লড়া মানুষটা একটু সুখে নিশ্বাস নিতে পারবে। কিন্তু প্রকৃতির নিজস্ব কিছু নির্মম পাণ্ডুলিপি থাকে, যেখানে মানুষের স্বপ্নগুলো বড্ড তুচ্ছ।

টানা কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ আর উজান থেকে ধেয়ে আসা ঢল মুহূর্তেই বদলে দিল চিরাচরিত সেই দৃশ্যপট। রাতের অন্ধকারে বাঁধ ভেঙে রাক্ষুসী পানি বিলে ঢুকতে শুরু করল। প্রথমে ধীর লয়ে, তারপর উন্মত্ত জানোয়ারের মতো। ভোরের আলো ফোটার আগেই নিস্তরঙ্গ গ্রামটি কেঁপে উঠল মানুষের আর্তনাদে— “পানি আইতাছে! সর্বনাশ হইয়া গেল রে!”

আহাদ মিয়া পাগলের মতো ছুটে গেলেন জমির দিকে। কিন্তু হায়! কোমর সমান পানি তখন উন্মত্ত নৃত্য করছে তার স্বপ্নের ওপর। চোখের সামনে সোনালি ধানের শীষগুলো একে একে জলের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, একঝাঁক অসহায় মানুষ শেষ নিশ্বাস নেওয়ার আগে হাত তুলে বাঁচার মিনতি জানাচ্ছে, আর পানি তাদের নির্মমভাবে ডুবিয়ে দিচ্ছে।

তিনি পানিতে নামলেন। এক মুঠো ধান বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে হাতড়াতে লাগলেন। কিন্তু সর্বগ্রাসী পানির কাছে মানুষের এই ক্ষুদ্র লড়াই তখন বড় বেশি অসহায়। যে ধান ঘরে তোলার প্রতিক্ষায় তিনি দিন গুনছিলেন, সেই প্রাণবন্ত ধান্যলতাগুলো কাদার নিচে নিঃশব্দে পচতে শুরু করেছে। চারদিকে হাহাকার—কেউ গবাদি পশু বাঁচাতে ব্যস্ত, কেউ ঘরের চাল আঁকড়ে ধরেছে, কেউ বা আকাশের দিকে দুই হাত তুলে নিয়তিকে অভিশাপ দিচ্ছে।

আহাদ মিয়া শুধু স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তার বুকের গভীর থেকে একটা তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল। বাম পাশটা হঠাৎ শিসের মতো তীক্ষ্ণ ব্যথায় বিদ্ধ হলো। চোখের মণি জুড়ে তখন সিনেমার রিলের মতো ঘুরছে—ঋণের কিস্তির কাগজ, পাওনাদারের রুক্ষ কণ্ঠ, মেয়ের ম্লান মুখ আর স্ত্রীর সেই ফ্যাকাশে দৃষ্টি। ধানের শীষগুলো ছুঁয়ে কাঁপা গলায় শুধু একবার উচ্চারণ করলেন, *”সব শ্যাষ রে মাবুদ… সব শ্যাষ…”

তার কণ্ঠে তখন কোনো হাহাকার ছিল না, ছিল কেবল এক নিঃস্ব মানুষের শেষ সমর্পণ। মাঠের মাঝখানে তিনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। এক হাতে ধরা কাদা মাখা আধপাকা ধান, অন্য হাত নিজের অবাধ্য বুকের ওপর। এরপর ধীরে ধীরে তার শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এলিয়ে পড়ল সেই ঘাতক পানির ওপর।

মানুষ ছুটে এল। উদ্ধার করে তাকে তীরে আনা হলো। কিন্তু ততক্ষণে আহাদ মিয়া চলে গেছেন সীমানা ছাড়িয়ে—যেখানে ঋণের বোঝা নেই, নেই কোনো ফসলহানির ভয়। আশ্চর্যের বিষয়, তার নিথর হাতের মুঠোয় তখনও শক্ত করে ধরা ছিল সেই আধপাকা ধানের শীষ। যেন মৃত্যুর ওপারেও তিনি কৃষকের সেই অপূর্ণ স্বপ্নটুকু সাথে করে নিয়ে যেতে চান।

বিকেলের দিকে যখন তার মরদেহ উঠানে আনা হলো, বাইরের বৃষ্টি তখনও নির্লিপ্তভাবে হাওর গিলে খাচ্ছিল। গ্রামের বধূদের বিলাপ আর শিশুদের আতঙ্কিত চোখের মাঝেও প্রকৃতির কোনো বিকার ছিল না।

সূর্য সেদিন মেঘের আড়ালেই মুখ লুকিয়ে নিয়েছিল। আহাদ মিয়ার অবোধ ছোট ছেলেটি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু বারবার জিজ্ঞেস করছিল— “আব্বা উঠবো না?”

সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাধ্য কারোর ছিল না। কারণ, বাংলার কৃষকের এই নিরব প্রস্থানের কোনো সহজ উত্তর পৃথিবীর কোনো অভিধানে নেই।

এ দেশে যখন একটি ফসলের মৃত্যু হয়, তখন কেবল কিছু দানা নষ্ট হয় না; বরং ধ্বংস হয়ে যায় একটি পরিবারের মেরুদণ্ড, থমকে যায় একটি শিশুর ভবিষ্যৎ, আর নিঃশেষ হয়ে যায় একজন পিতার তিল তিল করে গড়ে তোলা আত্মসম্মান।

পত্রিকার পাতায় এটি হয়তো স্রেফ দুই কলামের একটি সংবাদ— “ফসলহানির শোকে কৃষকের মৃত্যু।” কিন্তু সেই কয়েকটা শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকে একটি আস্ত পৃথিবীর সলিল সমাধি।

হাওর-বিল আর পলিমাটির এই জনপদে প্রতিবছর অসংখ্য আহাদ মিয়া জন্ম নেয়। তারা স্বপ্ন বোনে, রোদে পোড়ে, বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করে, আবার সেই বৃষ্টির হাতেই সব বিসর্জন দেয়। তবুও মানুষটি বড় অদ্ভুত; সব হারিয়েও সে আবার লাঙল কাঁধে মাঠে নামে। কারণ পৃথিবীটাকে বাঁচিয়ে রাখার দায় যে কেবল তাদেরই।

হয়তো অন্য কোনো মেঘলা বিকেলে, ওপার থেকে আহাদ মিয়া তাকিয়ে দেখবেন—তারই মতো অন্য কোনো কৃষক সোনালি ধানের সোনালি হাসিতে পৃথিবী রাঙিয়ে তুলছে। আর সেই হাসিতেই বেঁচে থাকবে আহাদ মিয়ারা।

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার। 

লেখক : আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা। 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category