-প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিবেশী পরিবর্তনযোগ্য নয়। বাংলাদেশ ও ভারত পরস্পরের সাথে চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ স্থল সীমান্ত শেয়ার করে। দুই দেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে হাজার বছরের ভাষা, সংস্কৃতি ও নিবিড় বাণিজ্যিক মেলবন্ধন। স্বাভাবিক নিয়মেই এই দুই রাষ্ট্র পরস্পরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিনের এই ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক নৈকট্য সত্ত্বেও, ভারতের ‘বিগ ব্রাদার’ বা দাদাগিরি সুলভ আচরণ উপমহাদেশের অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনেও গভীর ক্ষোভ ও দূরত্ব তৈরি করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে জনগণের সাথে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সম্পর্কের উন্নয়ন না করে, একটি বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর প্রতি অতিমাত্রায় ঝুঁকে থাকার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের সচেতন জনগণ কখনোই মেনে নেয়নি। ফলশ্রুতিতে, ভারতের এই একপেশে নীতি শেষ পর্যন্ত খোদ ভারতের জন্যও কোনো দীর্ঘমেয়াদি লাভ বা ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তি বয়ে আনতে পারেনি।
সম্প্রতি বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে একজন সাবেক মন্ত্রীকে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাটি দৃশ্যত এটিই প্রমাণ করে যে, ভারত এখন বাংলাদেশকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে থাকা নীতি-নির্ধারকদের এটি অনুধাবন করতে হবে যে, বাংলাদেশের জনগণের মনস্তত্ত্ব এবং সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে কোনো চতুর বা একপেশে কূটনীতি সফল হতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা বিভিন্ন প্রচারণায় যখন ‘দুই দেশ এক করার’ মতো অবাস্তব বা সস্তা রাজনৈতিক আওয়াজ তোলা হয়, তখন তা এদেশের মানুষের মনে নতুন করে সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকির আশঙ্কা তৈরি করে।
যদি সত্যিই একাত্মতার সদিচ্ছা থাকে, তবে রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক একীকরণের সস্তা আলাপের আগে পারস্পরিক ন্যায্যতার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। দুই দেশ এক করার অবাস্তব প্রতিশ্রুতির চেয়ে বড় পরীক্ষা হলো অভিন্ন নদীগুলোর ওপর থেকে কৃত্রিম ও আন্তর্জাতিক আইন বহির্ভূত বাঁধ তুলে দেওয়া। দুই দেশের মানুষকে এক করার আগে, ভারত কর্তৃক একতরফাভাবে আটকে রাখা জলরাশিকে মুক্ত করে কৃত্রিম বাঁধের দুই পাশের জলকে একসাথে মিশে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না করে ভ্রাতৃত্বের ফাঁকা বুলি কেবলই এক ধরনের কূটনৈতিক পরিহাস।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই অঞ্চলকে এক করার চেয়ে বিভাজনের রাজনীতিতেই ভারতের তৎকালীন কিছু উগ্র ঘরানার নেতার ভূমিকা ছিল মুখ্য। ১৯৪৭ সালে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির মতো নেতাদের উগ্র সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণে যদি তৎকালীন বাংলা ভাগ না হতো, তবে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা মিলে এই উপমহাদেশে এক বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটত। সেই ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করে আজকে যখন নতুন করে মৈত্রীর সস্তা বয়ান তৈরি করা হয়, তখন তা এদেশের মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
ভারতকে বুঝতে হবে যে, সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ এবং পরস্পরের স্বার্থ রক্ষাকারী একটি ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’ বা পারস্পরিক লাভজনক ব্যবস্থার মাধ্যমেই কেবল স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা সম্ভব। নতুন কূটনীতিকরা যতই প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদ বা প্রাক্তন মন্ত্রী হোন না কেন, বাংলাদেশে তাঁদের আগমন ঘটেছে কূটনীতিক হিসেবে, কোনো রাজনৈতিক প্রচারক হিসেবে নয়। সুতরাং, অমূলক ও সস্তা রাজনৈতিক আলাপ বাদ দিয়ে পারস্পরিক সমতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও বাণিজ্য ঘাটতি দূর করার মতো বাস্তবমুখী কূটনৈতিক আলাপে মনোযোগী হওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
যেকোনো ধরনের জেদাজেদি, আধিপত্যবাদী মনোভাব বা ভুল বোঝাবুঝি উভয় রাষ্ট্রের জন্যই কেবল ক্ষতির কারণ হবে। সমতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের পথে এগিয়ে যাওয়াই বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় রাষ্ট্রের টেকসই সমৃদ্ধির একমাত্র পরম যৌক্তিক পথ।
লেখক: ভিসি, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।