এম এ কাদের অপু
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার শাকপুর ইউনিয়নের রাজপুর গ্রামের এক বৃদ্ধ বাবা ও তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়ের মানবেতর জীবনযাপনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর দ্রুত হস্তক্ষেপ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামান রনি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি বৃদ্ধ বাবাকে ছেলেদের পারিবারিক আবাসে ফিরিয়ে দেন এবং সন্তানদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছয় সন্তানের জনক ওই বৃদ্ধ ব্যক্তি জীবনের অধিকাংশ সময় কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানদের মানুষ করেছেন। কিন্তু বার্ধক্যে এসে তাঁকে একটি মুরগির খামারঘরে বসবাস করতে হচ্ছিল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী এক মেয়ে। অভিযোগ রয়েছে, ছেলেরা নিজ নিজ পরিবার নিয়ে পাকা ভবনে বসবাস করলেও বৃদ্ধ বাবা ও প্রতিবন্ধী মেয়ের যথাযথ ভরণপোষণ ও দেখভালের দায়িত্ব পালন করছিলেন না।
বিষয়টি স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে জনসমক্ষে তুলে ধরেন। সংবাদ প্রকাশের পর এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে।
খবর পেয়ে ইউএনও আসাদুজ্জামান রনি দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। সেখানে তিনি বৃদ্ধ বাবা, পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে বৃদ্ধ বাবার নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন।
এ সময় ইউএনও বলেন, “বাবা-মায়ের ভরণপোষণ ও সেবা-যত্ন করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি আইনগত বাধ্যবাধকতাও।”
তিনি পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করে জানান, ভবিষ্যতে বৃদ্ধ বাবা বা তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়ের প্রতি অবহেলা কিংবা নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের এই মানবিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সমাজে প্রবীণ বাবা-মায়ের প্রতি অবহেলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ অন্যদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি অবহেলা ও একাকীত্বের শিকার হচ্ছেন। অথচ একজন মানুষের জীবনে বাবা-মায়ের অবদান অপরিসীম। তাই তাঁদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করা পরিবার ও সমাজ উভয়ের দায়িত্ব।
গণমাধ্যমকর্মীদের মতে, এ ঘটনা সাংবাদিকতার সামাজিক দায়বদ্ধতারও একটি ইতিবাচক উদাহরণ। স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রকাশিত প্রতিবেদন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত একজন অসহায় বৃদ্ধ তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা ফিরে পেয়েছেন।
রাজপুর গ্রামের এই ঘটনা এখন শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি সমাজের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বার্ধক্যে বাবা-মাকে অবহেলা নয়, বরং সম্মান ও ভালোবাসার সঙ্গে পাশে দাঁড়ানোই একজন সন্তানের প্রকৃত পরিচয়। আর সেই মানবিক মূল্যবোধ রক্ষায় প্রশাসন ও গণমাধ্যমের যৌথ ভূমিকার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল বরুড়ার এই ঘটনা।
এটি সরাসরি পত্রিকা বা অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশযোগ্য ফরম্যাটে সম্পাদনা করা হয়েছে।