সম্পাদক ও প্রকাশক (কলাম ০১)
রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিয়ে আমরা প্রায়ই অবকাঠামো, নীতি বা সংস্কারের কথা বলি। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—মানুষের মানসিকতা না বদলালে কি সত্যিই রাষ্ট্র বদলানো সম্ভব?
বাংলাদেশ আজ ১৮ কোটির মানুষের দেশ। এই বিপুল জনসংখ্যার প্রত্যেকের হৃদয়ে যদি দেশপ্রেম, সহমর্মিতা এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত না হয়, তবে কেবল রাস্তা-ঘাট, সেতু বা দালানকোঠা নির্মাণ করে একটি আদর্শ রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার মানুষের চিন্তাধারায়, তাদের পারস্পরিক আচরণে এবং সম্মিলিত চেতনায় নিহিত।
আজকের সমাজে হিংসা, প্রতিহিংসা, বিভাজনমূলক রাজনীতি এবং স্বার্থপর অর্থনৈতিক মনোভাব আমাদের সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আমরা একে অপরের সমালোচনায় ব্যস্ত, কিন্তু পরস্পরের মঙ্গল কামনায় অনীহা। অথচ একটি সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহানুভূতি এবং সহযোগিতার উপর।
সংস্কার কখনোই কাঠামোগত সংকটের পূর্ণ সমাধান দিতে পারে না, কারণ তা বিদ্যমান ব্যবস্থার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যখন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা বৈষম্য, দুর্নীতি এবং স্বৈরাচার পুনরুৎপাদনের উপযোগী হয়ে ওঠে, তখন প্রয়োজন হয় মৌলিক পুনর্গঠন—একটি নতুন করে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রচিন্তার। এই “পুনর্জন্ম” সম্ভব কেবল তখনই, যখন জনগণ নিজেরাই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে, জনতার মুক্তিমুখী যুক্তি ও অংশগ্রহণের উপর ভিত্তি করে “অ্যাপ্লাইড ডেমোক্রেটিক” দর্শন একটি কার্যকর পথ দেখাতে পারে। এটি এমন একটি ধারণা, যেখানে জনগণ কেবল ভোটার নয়, বরং রাষ্ট্র নির্মাণের সক্রিয় অংশীদার।
প্রবাসীরা এই পরিবর্তনের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থেকে শৃঙ্খলা, সততা ও উন্নত নাগরিক আচরণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাদের মাধ্যমেই দেশে ইতিবাচক চিন্তার প্রচার শুরু হতে পারে। দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উজ্জ্বল করতে এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করতে তাদের অবদান অপরিসীম।
আজ সময় এসেছে—আমরা হিংসা-প্রতিহিংসা ত্যাগ করে মানুষের পাশে দাঁড়াই, একে অপরকে সহযোগিতা করি এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনে নিজেদের নিয়োজিত করি। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয় মানুষের মন থেকে।
শেষ কথা:
আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা কাঠামো নয়, মানসিকতা। আর সেই মানসিকতার পরিবর্তনই হতে পারে বাংলাদেশের একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের সূচনা।