নিজস্ব প্রতিবেদক:
আশুলিয়ায় নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলারের পাশ থেকে অটোভ্যানচালক মো. সুজন হাওলাদার (২৯)-এর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলা। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে মো. মারুফ এবং লুণ্ঠিত অটোভ্যানের ক্রেতা তানভীর ঢালি ওরফে আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার দুজনের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতি, নিহতের অটোভ্যান ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। পিবিআই জানায়, গ্রেপ্তার দুজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা সুজন হাওলাদার গত ৮ আগস্ট বিকেল ৫টার দিকে অটোভ্যান নিয়ে বাসা থেকে বের হন। রাত ৯টার দিকে স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে শেষবার কথা বলেন তিনি। এরপর তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
পরদিন ১০ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আশুলিয়া থেকে আবদুল্লাহপুরগামী সড়কের পাশে নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ৮১/১ ও ৮১/২ নম্বর পিলারের মাঝামাঝি স্থান থেকে সুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় আঘাত এবং গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল।
খবর পেয়ে নিহতের মা মোছা. আলো বেগম ও স্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন। পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। এ ঘটনায় নিহতের মা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। ১১ আগস্ট দায়ের করা মামলাটির নম্বর ৫৮। এতে দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরে পিবিআই ঢাকা জেলা স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে। পুলিশ পরিদর্শক (নিঃ) মো. জামাল উদ্দীন, বিপিএমকে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়।
পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম. এন. মোর্শেদ, পিপিএমের তত্ত্বাবধানে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পিবিআই।
এর ধারাবাহিকতায় ১১ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মাদারীপুর সদর থানার আনসার ক্যাম্পসংলগ্ন একটি অটো গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে মারুফ ও তানভীর ঢালি ওরফে আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে নিহত সুজনের লুণ্ঠিত অটোভ্যান উদ্ধার করা হয়। মারুফের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় সুজনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন। পরে মারুফের দেখানো মতে ঘটনাস্থলসংলগ্ন এলাকা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতিও উদ্ধার করা হয়।
পিবিআই জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মারুফ হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। অপরদিকে তানভীর ঢালি ওরফে আকাশ মারুফের কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকায় অটোভ্যানটি কেনার কথা স্বীকার করেন।
তদন্ত ও আসামিদের জবানবন্দির বরাতে পিবিআই জানায়, মারুফ পেশায় ভ্যানচালক এবং নিহত সুজনের পূর্বপরিচিত। ৮ আগস্ট রাতে তারা মোহাম্মদপুরে একসঙ্গে দেখা করেন। পরে সুজনের অটোভ্যান নিয়ে তারা গাজীপুরের কাশিমপুরে যান। সেখানে মালামাল বোঝাই করে লালবাগের উদ্দেশে রওনা হন।
ভোরের দিকে আশুলিয়া ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে অটোভ্যানটি বিকল হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও সেটি ঠিক করতে না পেরে তারা নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে অবস্থান নেন। পিবিআইয়ের তদন্তে সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করেছিলেন বলে তথ্য উঠে এসেছে।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম. এন. মোর্শেদ, পিপিএম বলেন, ইয়াবা সেবনের পর সুজন ঘুমিয়ে পড়লে মারুফ অটোভ্যানে থাকা একটি চাপাতি নিয়ে আসেন। পরে ৯ আগস্ট আনুমানিক রাত সাড়ে ১২টার দিকে প্রথমে পাথর দিয়ে সুজনের মাথায় আঘাত করেন। এরপর চাপাতি দিয়ে গলায় কোপ দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
তিনি বলেন, চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই পিবিআইয়ের একটি বিশেষ টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয় এবং ছায়া তদন্ত শুরু করা হয়। নিরলস তদন্তের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
পিবিআই জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।