বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, ভাতা এবং সেবা চালু থাকলেও বাস্তবে পরিবারবিচ্ছিন্ন, পিতৃহীন, মাতৃহীন ও পথে বসবাসকারী অনেক প্রতিবন্ধী শিশু এসব সুবিধার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো জন্মনিবন্ধনের অভাব এবং আইনগত অভিভাবকের অনুপস্থিতি।
জন্মনিবন্ধন একটি শিশুর প্রথম আইনগত পরিচয়। এটি শুধু একটি সনদ নয়; বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধী পরিচয়, ভাতা, ব্যাংকিং, আইনি সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতের নাগরিক অধিকার অর্জনের ভিত্তি। কিন্তু যেসব শিশু রাস্তায় বেড়ে ওঠে অথবা আশ্রয়কেন্দ্রে বাস করে, তাদের অনেকের জন্মের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নথি নেই। অনেকেই জানে না তাদের জন্মতারিখ, জন্মস্থান কিংবা বাবা-মায়ের পূর্ণ পরিচয়।
বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জন্মনিবন্ধনের জন্য সাধারণত পিতা-মাতা বা আইনগত অভিভাবকের তথ্য, ঠিকানা এবং স্থানীয় পর্যায়ে যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়। পরিবারবিচ্ছিন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে এই শর্ত পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় নথি বা অভিভাবক না থাকায় আবেদন গ্রহণে অনীহা দেখায় অথবা দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রক্রিয়া স্থগিত থাকে। ফলে বাস্তবে অসংখ্য শিশু জন্মনিবন্ধনের বাইরে থেকে যায়।
জন্মনিবন্ধন না থাকায় প্রতিবন্ধী শিশুদের আরেকটি বড় ক্ষতি হয় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য যে পরিচয়পত্র ও বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করা হয়, সেগুলোর জন্যও সাধারণত পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দরকার হয়। ফলে যেসব প্রতিবন্ধী পথশিশুর কোনো আইনগত পরিচয় নেই, তারা প্রতিবন্ধী পরিচয়, ভাতা এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়ে।
আরও একটি বাস্তব সমস্যা হলো—অনেক শিশু কোনো উপযুক্ত আইনগত অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে নেই। ফলে কোনো আর্থিক সহায়তা বা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা অনুমোদিত হলেও তা গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা বা শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই প্রশাসনিক শূন্যতা শিশুদের অধিকার বাস্তবায়নে বড় বাধা সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারবিচ্ছিন্ন ও আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসকারী শিশুদের জন্য একটি বিকল্প আইনগত অভিভাবকত্ব (Alternative Legal Guardianship) ব্যবস্থা, নিবন্ধিত শিশু সুরক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান এবং জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে নমনীয় ও শিশুবান্ধব পদ্ধতি চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, সমাজসেবা, শিশু বিষয়ক কর্তৃপক্ষ এবং নিবন্ধিত শিশু সুরক্ষা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো শিশুই কেবল পরিচয়ের অভাবে রাষ্ট্রের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়।
বাংলাদেশ যখন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন পরিচয়হীন ও পরিবারবিচ্ছিন্ন প্রতিবন্ধী পথশিশুদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি সংবিধানের সমতা, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নীতিরও একটি অপরিহার্য অংশ। একটি শিশুর পরিচয় নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি নিবন্ধন সম্পন্ন করা নয়; বরং তাকে রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তার ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করা।